Man's dearest possession is life. It is given to him but once, and he must live it so as to feel no torturing regrets for wasted years, never know the burning shame of a mean and petty past; so live that, dying he might say: all my life, all my strength were given to the finest cause in all the world- the fight for the Liberation of Mankind. - Nikolai Ostrovsky

Saturday, April 16, 2011

বিসর্জিত রবীন্দ্রনাথ - নোটুয়া (এবং সংবিত্তি, ৫ম বর্ষ, প্রথম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০১১)


১৮৯০ থেকে ২০১০, নয় নয় করে ১২০টা বছর। ৪৯ নম্বর পার্ক স্ট্রীট (সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাসগৃহ) থেকে কল্যাণীর ঋত্বিক সদন — এই দীর্ঘ রাস্তা অতিক্রম করেও রবি ঠাকুরের ‘বিসর্জন’ কালের পলিতে আটকে যায়নি, সময়ের সাথে তালে তাল রেখে পেছনে ফেলে এসেছে এক দীর্ঘ পথ। রবীন্দ্র-পরবর্তী যুগে, সেই পাঁচের দশকের শুরু থেকেই, উৎপল দত্ত, ঋত্বিক ঘটকরা বার বার প্রযোজনা করেছেন এই নাটক। ছয় এবং আটের দশকে শম্ভু মিত্র ও বিভাস চক্রবর্তী-র মতো প্রবাদপ্রতিম প্রয়োগবিদরা এই পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সামিল হয়েছেন। ছোট-বড় অনেক গোষ্ঠী বিভিন্ন সময় এগিয়ে এসেছে ‘বিসর্জন’ করতে। তাই আজ যখন সুমন মুখোপাধ্যায়ের মত একজন দক্ষ নাট্যব্যাক্তিত্বকে ‘বিসর্জন’ বেছে নিতে দেখি তখন অবাক হই না — অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করি।
‘তৃতীয় সূত্র’-র প্রযোজনা সম্পর্কে কিছু বলার আগে কয়েকটা কথা জানিয়ে রাখা প্রয়োজন। যারা এই নাটক পড়েছেন তারা জানেন, ‘বিসর্জন’ পড়তে যতটা ভালো লাগে, মঞ্চে উপস্থাপিত হলে তার সিকি ভাগ-ও লাগে না।বই-এর পাতা থেকে রক্ত-মাংসের মানুষ হয়ে ওঠার পর চরিত্রগুলোর আবেদন কোথায় যেন হারিয়ে যায়। রঘুপতি-রূপী ঋত্বিক ঘটক বা জয়সিংহ-রূপী শম্ভু মিত্র অথবা নক্ষত্র রায়ের বেশে মমতাজ আহমেদ খাঁ ব্যক্তিগত স্তরে উজ্জ্বল স্বাক্ষর রাখলেও ‘বিসর্জন’-কে মঞ্চসফল করে তুলতে পারেননি। সম্ভবত, নাটকটার গঠনের মধ্যেই এই অসাফল্যের বীজ নিহিত আছে। স্ট্রাকচারটা বেশ খাপছাড়া। অনেকগুলো চরিত্র আসে-যায়, কিন্তু দর্শক-মনে কন রেখাপাত করেনা। নাটকের শেষে চাঁদপালের বিশ্বাসঘাতকতা এবং তার সাথে নক্ষত্র রায়ের যোগ দেওয়ার ঘটনা অকারণ জটিলতা তৈরি করে, কেন্দ্রীয় বিষয় থেকে নাটক-কে সরিয়ে দেয় এবং অবধারিত ভাবে গতি শ্লথ করে দেয়। ‘রাজর্ষি’-তে (এই উপন্যাস অবলম্বনেই ‘বিসর্জন’ রচিত) কার্য-করণের যে সামঞ্জস্য আমরা দেখতে পাই, তা ‘বিসর্জন’-এ অনুপস্থিত। অপর্ণার একটা কথায় রাজার মনে পশুবলি সম্পর্কে বিতৃষ্ণা তৈরি হওয়া, বা কোনও রকম ব্যাখ্যা ছাড়াই পালিত-পুত্র ধ্রুবর একটিবারের জন্য মুখ দেখানো, অপর্ণা ও জয়সিংহর সম্পর্ক ঠিক ভাবে এস্ট্যাবলিশড না হওয়া, ইত্যাদি, নাটকের কাঠামোকে দুর্বল করে দিয়েছে। আর একটা সমস্যা হ’ল কাব্যিক সংলাপ। ভার্স এক্টিং-এর সাংগীতিক ওঠা-নামা সার্থক ভাবে পরিবেশন করা যেকোনো অভিনেতার পক্ষেই কঠিন (শম্ভু মিত্র বা ঋত্বিক ঘটক একসেপশন)। গদ্য সংলাপের যে তীক্ষ্ণতা সাধারণভাবে দর্শককে প্রভাবিত করে, তা কাব্যে ঘটার সুযোগ কম। কিন্তু সেখানেও সমস্যা। নাটকটা গদ্যে নিয়ে এলে চরিত্রগুলো ভীষণ একমুখী হয়ে যায়। কবিতার আবরণ রঘুপতি, রাজা গোবিন্দমানিক্য, রানি গুণবতী ও জয়সিংহ কে যতটা মাল্টি ডাইমেনশানাল করে তোলে, তা খসে পড়লে সেটা থাকে না। চরিত্রগুলো নাঙ্গা হয়ে যায়। এই জন্যই হয়ত ‘থিয়েটার ওয়ার্কশপ’-এর ‘বিসর্জন’ খুব একটা মঞ্চসাফল্য পায়নি। যতদূর জানা যায়, প্রাথমিক ভাবে রবীন্দ্রনাথ ‘বিসর্জন’-কে মঞ্চ নাটক হিসাবে লেখেন নি। তাঁর সম্পাদিত ‘দ্য বিশ্বভারতী কোয়াটার্লি’ পত্রিকার (১৪ই আগস্ট, ১৯২৩) পাতায় লেখা রয়েছে, “The drama was not originally written for the stage.” পরে মঞ্চোপযোগী করে তোলার জন্য তিনি নিজেই বহুবার এর খোল-নলচে বদলেছেন। কিন্তু ব্যাপারটা দাঁড়ায়নি। ‘বিসর্জন’-এর ইংরাজি অনুবাদ ‘দ্য স্যাক্রিফাইস’-ও (যথেষ্ট মেদমুক্ত হওয়া সত্ত্বেও) খুব একটা অভিনয়যোগ্য নয়।
এবার আসা যাক সুমন মুখোপাধ্যায় নির্দেশিত ‘বিসর্জন’-এর কথায়। পর্দা ওঠার সাথে সাথে শোনা যায় দেবজ্যোতি মিশ্র-র গা ছমছমে আবহসঙ্গীত। দর্শক আসনে বসে চমকে উঠি! রবি ঠাকুরের নাটকে রামগোপাল ভার্মা এফেক্ট! আলো-আঁধারীর মাঝে দেখা যায় অপর্ণা-কে। তার প্রিয় ছাগলছানা দেবীর চরণে বলিপ্রদত্ব, তাই মন্দির প্রাঙ্গণে শুয়ে সে হাহাকার করছে, “ফিরায়ে দে, ফিরায়ে দে।” এর পর দেখা যায় মহারানী গুণবতী কে। মাতৃত্বের আবেদন নিয়ে এসেছেন মায়ের মন্দিরে। সন্তানলাভের জন্য তিনি এতটাই ব্যাকুল যে প্রতি বছর মায়ের চরণে “একশো মহিষ ও তিনশত ছাগ” বলি দিতে প্রস্তুত।  গুণবতীর বিলাপপর্ব চলাকালীন মঞ্চে আসেন মন্দিরের পুরোহিত রঘুপতি-বেশী গৌতম হালদার। নাটকের মৃত্যুঘন্টা বাজা শুরু হয়। যত এগোতে থাকে, দর্শক দাঁতে দাঁত চেপে রবীন্দ্র বলাৎকারের দৃশ্য দেখতে দেখতে হতবাক হয়ে যায়। রিলিজিয়াস ব্যুরোক্রেসির প্রতিনিধি রঘুপতি অধঃপতিত হয় সাইকোটিক রূপে। রবীন্দ্রনাথ রঘুপতিকে একজন সাধারণ মানুষ হিসাবে এঁকেছেন, উন্মাদ হিসাবে নয়। রঘুপতির সামাজিক-রাজনৈতিক গুরুত্ব তৈরি হয়েছে ধর্মের ভিত্তিতে। তাই যখন ধর্মীয় অনুশাসনে ব্যাঘাত আসে, তখন তিনি তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান, এমনকি রাজহত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। ধর্মীয় অনুশাসনকে উপলক্ষ করে তার কাছে প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়ায় তার নিজের সামাজিক-রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষা করা। আমলাতন্ত্রের জালে আটকা পড়া মানুষের এই দশা হতে বাধ্য। কিন্তু একে তো কোনও ভাবে সাইকোটিক বলা যায় না। নিজের সামাজিক অবস্থান ধরে রাখতে চেষ্টা করা একজন মানুষ (সে যে ভাবেই হোক না কেন) আর সাধারণ মানসিক রোগীর মধ্যে একটা তফাত তো আছে। গৌতম বাবুর অভিনয়ে সেই তফাত কোথাও ধরা পড়েনি। রবি ঠাকুরের রঘুপতি হয়ে উঠেছেন হিন্দি ফিল্মের উন্মাদ কাপালিক, খলনায়ক। মূল নাটকের শেষে রঘুপতির উত্তরণ ঘটে। জয়সিংহের মৃত্যু তাকে মুক্ত করে ধর্মীয় গোঁড়ামিকে আশ্রয় করে বেঁচে থাকা আমলাতন্ত্রের বাঁধন থেকে। অপর্ণাকে দেখে রঘুপতি বলে ওঠেন, “পাষাণ ভাঙিয়া গেল —জননী আমার/এবারে দিয়েছে দেখা প্রত্যক্ষ প্রতিমা!/জননী অমৃতময়ী!” কিন্তু সুমন মুখোপাধ্যায়ের ‘বিসর্জন’-এ এসবের বালাই নেই। রঘুপতির হাহাকার দিয়েই নাটক শেষ!
এই নাটকে রঘুপতির সাথে জয়সিংহের সম্পর্ক একটু অন্য ভাবে ব্যাখ্যা করতে চেষ্টা করেছেন নির্দেশক। সাধারণ গুরু-শিশ্য বা পিতা-পুত্রের বন্ধনে আটকে রাখেননি দুজনকে। রঘুপতির বাৎসল্যের মধ্যে কোথায় যেন মিশে আছে হোমোসেক্সুয়ালিটি। মুশকিল হল, আঁতেল বাঙালি সব কিছুতেই অন্যরকম কিছু খোঁজে। এখন হোমোসেক্সুয়ালিটির বাজার। ফলে...। নাটক দেখতে দেখতে মনে হ’ল, অরুণ মুখোপাধ্যায়-তনয় উত্তরাধুনিকতার সলীলে ডুব সাঁতার দিতে দিতে ভুলেই গেছেন যে, মনুষ্য চরিত্রের রহস্যের এপিসেন্টার নাভির নিচে নয়, তার অনেকটা ওপরে—মস্তিষ্কে।
আগেই বলেছি, 'বিসর্জন'-এর গঠনশৈলীর সমস্যা আছে। সেগুলোকে ‘রাজর্ষি’ ও ‘দ্য স্যাক্রিফাইস’-এর সাহায্য নিয়ে দূর করার বদলে নির্দেশক খোদার ওপর খোদকারী করার চেষ্টা করেছেন, এবং ডুবেছেন। ‘বিসর্জন’-এর সাথে যাত্রার কিছু আঙ্গিকগত মিল থাকলেও তা যাত্রা নয়। নাটকে অপর্ণা বৈষ্ণব দর্শনের প্রতীক, রাজার মন-পরিবর্তনের এক্সটারনাল স্টিমুলাস, বিবেক নয়। কিন্তু গোটা নাটকে অপর্ণা বিবেকের ভূমিকায় অভিনয় করে যায়। চরিত্রাভিনেত্রী তূর্ণা দাসের ফ্যাসফ্যাসে গলায় গাওয়া রবীন্দ্রসঙ্গীত দেখা দেয় গোদের ওপর বিষফোড়া হয়ে। গোবিন্দমানিক্যর ভূমিকায় বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায় যথাযথ। কিন্তু জয়রাজ ভট্টাচার্যের নক্ষত্র রায় কে গৌতম হালদারের রঘুপতির মতোই মেনে নেওয়া অসম্ভব। মেরুদণ্ডহীন মানুষ মানে যে ভাঁড় নয়, এটা সুমন বাবুর মাথায় রাখা উচিত ছিল। সঞ্চয়ন ঘোষ-এর গিমিক-সর্বস্ব মঞ্চনির্মণ এবং অন্যান্য অভিনেতাদের দুর্বল পারফর্মেন্স শুধুই বিরক্তি সৃষ্টি করে। দীপক মুখোপাধ্যায়ের আলোর কাজ অবশ্য বেশ ভালো। গোটা নাটকে যে একজনের অভিনয় দৃষ্টি আকর্ষণ করে, তিনি কৌশিক সেন। সব দিক থেকেই কৌশিক কে মানিয়ে গেছে জয়সিংহ-র চরিত্রে। অনবদ্য অভিনয় করে তিনি ছাপিয়ে গেছেন তাঁর সহাভিনেতাদের। বাকিদের শেখা উচিত ওনার থেকে।
‘তৃতীয় সূত্র’-র ‘বিসর্জন’ ভুল-ভ্রান্তিতে ভরা হলেও দর্শকের কাছে এক উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা। প্রথা ভাঙ্গার সাহসী প্রচেষ্টা সফল হয়নি ঠিকই, কিন্তু সাহসটা তো আছে নতুন কিছু করার।

No comments:

Post a Comment