মার্কিন
সাম্রাজ্যবাদের সেবাদাস তৃণমূলী খুদে ফ্যাসিস্টরা যে বাঙলা-কে ইন্দোনেশিয়া বানাবার
চেষ্টা করছে তা আরও একবার প্রমাণ করল ব্যারাকপুরের ঘটনা। পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জ
থেকে গুলি করে হত্যা করা হ’ল বামপন্থী কাউন্সিলর জমিল আখতার-কে। শ্রমিক
শ্রেণীর সংগঠনকে তছনছ করতে প্রথমেই দরকার সংগঠকদের নির্মূল করা – ফ্যাসিস্ট তৃণমূল এটা ভালোই জানে। এই নির্মূলীকরণের উদ্দেশ্যেই ১৯৩০-এর ২১
সেপ্টেম্বর ফ্যাসিস্ট যুবকদের সভায় মুসোলিনি বলেছিল, ‘love the rifle, adore the
machine-gun and in this scale of sentiments, do not forget the dagger’।
সেই একই কারণে জল্লাদ রফিক থেকে ওয়ারলর্ড শিশির-শুভেন্দু হয়ে ‘মাওবাদী’ কোটেশ্বর অবধি বলে ওঠে— ‘দিদি, আপনি আমাদের বুলেট দিন, আমরা
আপনার হাতে মেদিনীপুর তুলে দেবো’। মুসোলিনি থেকে মমতা –
সেই হিংসাত্মক ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে, রক্ত ঝরছে
শ্রমজীবী জনতার!
সরকারে আসার
পথ সুগম করতে শুধু মানুষের আবেগকেই ব্যাবহার করে না ফ্যাসিস্টরা, তারা অমানুষিক হিংসারও প্রয়োগ করে। বলা যেতে পাড়ে, হিংসাই
ফ্যাসিবাদের মুখ্য অস্ত্র। আজ পশ্চিম বাঙলার গ্রামাঞ্চলে যে ছবি আমরা দেখতে পাই,
পূর্ব এবং পশ্চিম মেদিনীপুরে যে ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখে আমাদের গলা
শুকিয়ে যায়, তা কোন নতুন ঘটনা নয়। আধুনিক যুগে এর উদ্ভাবক হ’ল ফ্যাসিস্টরা। শুভেন্দুর গুন্ডাবাহিনীর তাণ্ডবে খেজুরির মানুষ সাধারণ
জীবন যাপন করতে পাড়েন না, নিত্যনৈমিত্তিক সন্ত্রাসের পরিবেশে
তারা ভয় ভয় দিন কাটান (হ্যাঁ, খেজুরি বামদুর্গ, তবুও...)—এগুলো সবই ফ্যাসিস্টদের থেকে
উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া। সরকারে না থেকেও যে মানুষকে সন্ত্রস্ত করে প্রভাব
বিস্তার করা যায় এবং ভোটে জেতা যায়, এটা মুসোলিনির থেকে
তৃণমূলীরা শিখেছে।
১৯১৯।
ফ্যাসিস্ট পার্টির আপিসের সামনে সমাজতন্ত্রীরা কফিন হাতে মিছিল করলেন—ইলেকশন-এ মুসোলিনি ধুয়ে মুছে সাফ! নাহ, এই অপমান
মুসোলিনি ভোলেনি। ১৯২০/২১ সালে সোশালিস্টদের শক্ত ঘাঁটি উত্তর ইতালির পো নদী ও
এপেনাইন পর্বতমালার মধ্যবর্তী উপত্যকা বোলোগ্মা প্রদেশ (১৯২৬ সালে এখানেই
মুসোলিনিকে গুলি করে হত্যা করার চেষ্টা করেছিল ১৫ বছর বয়েসি এক নৈরাজ্যবাদী কিশোর)
থেকে শুরু করেছিল অপারেশন। বোলোগ্মার গ্রামাঞ্চলে ভূস্বামীদের নেতৃত্বে চালু
হয়েছিল ফ্যাসিস্ট আক্রমণ, খুনে স্কোয়াডগুলোর কম্যান্ডার ছিল
জোতদার-জমিদারদের সন্তানরা। ঐতিহাসিক Charles F. Delzell বলেছেন— ‘...toward the end of 1920, fascism
began to spread into the countryside, bidding for the support of large
landowners, particularly in the area between Bologna and Ferrara, a traditional
stronghold of the Left, and scene of frequent violence. Socialist and Catholic
organizer of farm hands in that region, Venezia Giulia, Tuscany, and even
distant Apulia, were soon attacked by squads of Fascists, armed with castor
oil, blackjacks, and more lethal weapons.’ বোলোগ্মা থেকে ইতালির
প্রধানমন্ত্রী-কে পাঠানো প্রশাসনিক রিপোর্টে বলা হয়েছিল লাঠি এবং রিভলভার-এ সজ্জিত
ফ্যাসিস্ট লুম্পেনদের ভয়ে কিভাবে বাম ইউনিয়ন এবং পুরসভার প্রতিনিধিরা ঘরছাড়া
হচ্ছিলেন, কিভাবে হুমকি দিয়ে উঠিয়ে দেওয়া হচ্ছিল একের পর এক সোশালিস্ট
ক্লাব, ধ্বংস করা হচ্ছিল অর্ধশতাধিক পার্টি অফিস, কিভাবে শহরগুলোতে শ্রমিকদের মার দিয়ে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছিল ঘরের ভেতর। তিন
মাসের মধ্যে খুন করা হয়েছিল শুধু বুদরিত্ত শহরের ১০২ জন বামপন্থীকে। রিপোর্টে বলা
হয়েছিল, ‘শহরের জনজীবন স্তব্ধ’।
ওপরে বর্ণিত
রিপোর্ট-এর কিছু জায়গা, যেমন— সংগঠন ও
স্থানের নাম, সাল, ইত্যাদি বদলে যদি
তৃণমূল, খেজুরি এবং ২০০৮ বা ০৯ বা ১০-১১ করে দেওয়া হয়,
তাহলে আমরা আজকের বাঙলার সাথে সেদিনের বোলোগ্নার এক অদ্ভুত সাযুজ্য
লক্ষ্য করবো, মিলে যাবে ১৯২১ এবং ২০০৮/০৯/১০/১১...।
ফ্যাসিবাদের
ইতিহাস থেকে মানুষকে সন্ত্রস্ত করার পাঠ নিয়েছে মমতা ব্যানার্জী ও তাঁর
সাঙ্গপাঙ্গরা। কিন্তু যে পাঠটা ওরা নেয়নি তাহলো এই যে, যখন জনগণের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে যায়, তখন তারা
প্রতিবিপ্লবী হিংসাকে দমন করার জন্যে বিপ্লবী হিংসা আমদানি করেন, প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এর পরিণতিতে ইতালির ক্ষুব্ধ বিদ্রোহী জনগণ মুসোলিনিকে
তার চেলাচামুণ্ডা ও রক্ষিতা সমেত মিলানের মাংসের বাজারে লোহার হুকে ঝুলিয়ে দেন,
মুহুর্মুহুর পাথর বৃষ্টি করেন। আজ যে বাঙলার গ্রামাঞ্চলের
শান্তিপ্রিয় দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষক জনতা প্রতিরোধী সংগ্রামে শামিল হচ্ছেন তার কারণ
গত দু-তিন বছরে তৃণমূলীদের ফ্যাসিস্ট সন্ত্রাস। এই প্রতিরোধ সংগ্রামও গণতান্ত্রিক
সংগ্রাম, নিজের অর্জিত অধিকারগুলো রক্ষা করার সংগ্রাম। এটা
আক্রান্ত মানুষের গণতন্ত্র।
এই লড়াই আগামী দিনে আরও
বৃদ্ধি পাবে, কেননা অত্যাচারীকে প্রশ্রয় দেওয়ার অর্থই মৃত্যু।
No comments:
Post a Comment