হেমন্তের প্রথম মাসে গোকুল-কুমারীরা কাত্যায়নীর জলে স্নান করতে গেলেন। কোন এক ফাঁকে জলকেলিতে ব্যস্ত সুহাসিনীদের বস্ত্র হরণ করলেন শ্যামসুন্দর। স্নানের পর গোপিনীরা বস্ত্র ফেরত চাইলে তাদের বললেন পাড়ে উঠে এসে নিজ নিজ বসন নিয়ে যেতে। নন্দগোপের পুত্রের জেদের কাছে ব্রজকুমারীরা নতি স্বীকার করলেন, জলজ উদ্ভিদের সাহায্যে কোনক্রমে লজ্জা নিবারণ করে এসে দাঁড়ালেন কৃষ্ণের সামনে। মাধব অল্প হেসে জানালেন যে দু হাত তুলে তাকে প্রণাম না করলে তিনি বস্ত্র ফেরত দেবেন না। এহেন সংকটের সম্মুখীন হয়ে তারা দুহাত মাথায় ঠেকিয়ে আদেশ পালন করলেন। খসে গেল পাতার পোশাক।...
বুর্জোয়া ব্যবস্থার লজ্জা রোধ করার পাতার পোশাকের নাম সংসদ। পুঁজিবাদ যখনই প্রবল সংকটের মুখোমুখি হয়, তখনই সংসদীয় পথে আমদানি ঘটে ফ্যাসিবাদের। ক্ষমতার অলিন্দে পৌঁছে এই পোশাক খসিয়ে দেয় ফ্যাসিস্টরা। কায়েম করে সামরিক একনায়কতান্ত্রিক শাসন। এক ধরণের ফ্যাসিবাদ সংবিধানবিরোধী স্লোগানের ভিত্তিতে শাসন চালায়। আরেক ধরণের ফ্যাসিবাদও আছে, যা নাকি পার্লামেন্টারি ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে নিজেকে সংবিধান ও গণতন্ত্রের সাচ্চা প্রহরী হিসাবে মিলে ধড়ে এবং জনগণকে মোহাচ্ছন্ন করার ফন্দী আঁটে (৩-এর দশকের মার্কিন ফ্যাসিবাদ সম্পর্কে কমরেড দিমিত্রভ)। প্রথম গোষ্ঠীর কাণ্ডকারখানা আমরা জার্মানি এবং ইতালিতে দেখেছি। এদের সহজেই চেনা যায়। কিন্তু যে ফ্যাসিস্ট দল একটা গণতান্ত্রিক চাদর চরিয়ে ঘুরে বেড়ায়, তাকে চিনতে সময় লেগে যায়। শেষোক্ত অংশ সংসদকে রূপান্তরিত করে ছোট্ট ‘ডুমুর পাতা’য়—আঙ্গিকটা থাকে ‘গণতান্ত্রিক’, এসেন্সটা হয়ে ওঠে ফ্যাসিস্ট।
বিশ্বসাম্রাজ্যবাদ মমতার মধ্যে এই এসেন্সটাই খুঁজে পেয়েছে।
মমতাকে ডিমক্রেসির ঠিকাদার বানিয়ে বাঙলার আইনসভাকে ডুমুর পাতায় পরিণত ক’রে বল্গাহীন সন্ত্রাস চালাতে চায় সাম্রাজ্যবাদ। উদ্দেশ্য— কম্যুনিস্টদের শারীরিক এবং মানসিক, উভয় উপায়েই নির্মূল করা। এই লড়াইয়ে তাদের দামি বাজির নাম মমতা। এর আগেও সাম্রাজ্যবাদীরা কম্যুনিস্টদের উৎখাত করতে চেষ্টা করেছে। মইনিহান সাহেব তো পরিষ্কার দেখিয়েই দিয়েছেন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ কিভাবে ১৯৫৯ সালে কংগ্রেসিদের টাকা খাইয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে কেরল সরকারকে ফেলে দিয়েছিল। এই একই ঘটনার বিবরণ উঠে এসেছে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত Howard Schaffer-এর লেখায়। Schaffer লিখছেন— ‘নয়া দিল্লিতে বাঙ্কারের কার্যকালে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আমেরিকার সবথেকে সুদূরপ্রসারী হস্তক্ষেপ ঘটে কেরালায়... আইজেনাওয়ার প্রশাসন প্রথমে অপেক্ষা ‘করো আর দেখো’ নীতি গ্রহণ করে রাজ্যের সিপিআই সরকারের প্রতি, কিন্তু শীঘ্রই শত্রুভাবাপন্ন হয়ে ওঠে। বাঙ্কারের দূতাবাস ওয়াশিংটনের সঙ্গে সহমত পোষণ করে এবং সুপারিশ পাঠায় ওটা বাস্তবায়িত করার জন্য। পরিণামস্বরূপ, একটা গোপনীয় সিআইএ অপারেশন পরিচালিত হয় কম্যুনিস্টদের ক্ষমতা থেকে উৎখাত করার জন্য। স্পষ্টতই প্রতীয়মান যে সিআইএ কংগ্রেস এবং অন্যান্য বিরোধীদের রাজনৈতিক বিক্ষোভ প্রদর্শনের জন্য অর্থ সরবরাহ করতে থাকে যা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে যথাযোগ্যভাবে বিশৃঙ্খল করে দিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপ বাধ্য করে যাতে কেরালা সরকারকে বরখাস্ত করা সম্ভব হয়। এরকম আভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা উল্লেখ করে নয়া দিল্লি কম্যুনিস্টদের ১৯৫৯ সালে জোর করে সরিয়ে দেয়।’
বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক শিবিরের পতন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে আরও হিংস্র করে তুলেছে। এখন ওরা নেমেছে বামপন্থীদের অন্যতম শেষ দুর্গ বাঙলা-কে বামমুক্ত করতে। বছর দু-এক আগে মার্কিন সিনেটে নন্দীগ্রাম সম্পর্কে আলোচনা, সোনাচুরার তৃণমূলী পঞ্চায়েত প্রধান নিশি মণ্ডলের ঘরে সিয়া এজেন্ট টমাস কোচারির উপস্থিতি, বামপন্থীদের নেতৃত্বে তৃতীয় মোর্চা যাতে তৈরি না হতে পাড়ে— সেই নিয়ে তৎপরতা (সুত্রঃ উইকিলিকস), ন্যুইয়র্ক টাইমস-এর পাতায় একাধিকবার মমতা এবং তৃণমূল-কে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে লেখা প্রবন্ধ, শুভাপ্রশন্নর রায়চকের বাগানবাড়ীতে জার্মান-মার্কিন-ব্রিটিশ কনসালদের মিটিং, পরিষ্কার ভাবে উন্মোচিত করেছে সাম্রাজ্যবাদী বদমায়েশি। নিজেদের সমস্ত টেকনোলোজি নিয়ে ওরা নেমে পড়েছে তৃণমূল-কে ভোটে জেতাতে। চলছে ইভিএম দখলের ষড়যন্ত্র—যন্ত্রের কারচুপি। সাম্রাজ্যবাদের দালাল প্রণব মুখার্জী মমতাকে আশ্বস্ত করেছে।
আর দেরি করার সময় নেই কমরেডস। আজ আমাদের প্রধান কাজ হ’ল সমস্ত বাঁধা জয় করে অষ্টম বামফ্রন্ট সরকার গঠনে সাহায্য করা, ১৯২২ সালে গৃহীত তৃতীয় আন্তর্জাতিকের রণকৌশলগত থিসিস-এর এই কথাগুলো কাজে পরিণত করা— ‘কম্যুনিস্ট পার্টিগুলোর একটা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য হ’ল... ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগঠিত করা। ফ্যাসিস্ট ঠ্যাঙ্গারে বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাদেরকে অবশ্যই শ্রমিক শ্রেণীর অগ্রভাগে থাকতে হবে, এই প্রশ্নে যুক্তফ্রন্ট গড়ে তোলার ব্যাপারে তাদের অত্যন্ত সক্রিয় হতে হবে এবং তারা অবশ্যই সংগঠনের বেআইনি পদ্ধতি ব্যবহার করবে।’
কমরেডস, আসুন, বেয়োনেটের আঘাতের পরোয়া না করে কাস্তেটা শাণ দিই, সূর্যের উত্তাপে রাঙিয়ে তুলি!

No comments:
Post a Comment