Man's dearest possession is life. It is given to him but once, and he must live it so as to feel no torturing regrets for wasted years, never know the burning shame of a mean and petty past; so live that, dying he might say: all my life, all my strength were given to the finest cause in all the world- the fight for the Liberation of Mankind. - Nikolai Ostrovsky

Saturday, April 16, 2011

ফ্যাসিবাদ ও মধ্যবিত্ত (সম্পাদকীয় 'এই তো সময়' প্রথম বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা, ৩১এ মার্চ, ২০১১)



১৮৬৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর। প্রথম আন্তর্জাতিকের গুরুত্বপূর্ণ সভা চলছে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নির্বাচনের সময় উপস্থিত। মার্কসকে সভাপতি করার প্রস্তাব পেশ করলেন লরেন্স, কার্টার সমর্থন করলেন। কিন্তু মার্কস সহমত হতে পারলেন না। তিনি প্রস্তাব করলেন অডগারের নাম, কেননা he… thought himself incapacitated because he was a head worker and not a hand worker.’ বৌদ্ধিক শ্রমের সাথে শারীরিক শ্রমের কোন বৈরীমূলক দ্বন্দ্ব না থাকলেও মার্কস নেতা হিসাবে বেঁছে নিলেন এমন একজন মানুষকে, যিনি প্রত্যক্ষ ভাবে কায়িক শ্রমে অংশগ্রহণ করেন। এখন প্রশ্ন, দুজনেই যদি শ্রমিকহয় তাহলে নেতা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে এমন একপেশেমি কেন? সমাজ বিজ্ঞানের পাঠ থেকে আমরা জানতে পারি যে  বুদ্ধিজীবী ও মেধাবৃত্তিকাররা সাধারণত অনুৎপাদনকারী শহুরে মধ্যশ্রেণী থেকে উদ্ভূত, ফলে স্বাভাবিক ভাবেই সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে দোদুল্যমান। (এক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার যে মধ্যশ্রেণী বা পাতিবুর্জোয়ারা মানে আজ আর শুধু খুদে ব্যবসাই নয়। ম্যানেজার, সুপারভাইজার, অধ্যাপক, ইত্যাদিরাও এই শ্রেণীরই অংশ। বলা জেতে পারে এরা হsalaried employees of capitalism।) সমাজ বিপ্লবে মধ্যশ্রেণীর কোন স্বাধীন ভূমিকা থাকে না। এদের সামনে থাকে দুটোমাত্র পথঃ (১) হয় পুঁজিপতি শ্রেণীর সেবা করা, নয়তো (২) শ্রমিক শ্রেণীর সেবা করা।
মধ্যশ্রেণীর সাংস্কৃতিক-মনস্তাত্ত্বিক গঠনটাই বেশ অদ্ভুত। এদের প্রগতিশীল অংশ যেমন শ্রমিক শ্রেণীকে রাজনৈতিক চেতনাসম্পন্ন হয়ে উঠতে সাহায্য করে, সর্বহারার প্রধান সহযোগী হয়ে অমূল্য ভূমিকা পালন করে,  ঠিক তেমন ভাবেই প্রগতিশীলতার মুখোশ পোরে এই শ্রেণীর সুবাধবাদী অংশ শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলনকে ছুঁড়ি মারতেও দ্বিধা করে না। এরা বুর্জোয়াদের হাতে ক্রমাগত শোষিত হয়, কিন্তু কোন ভাবেই সর্বহারার বৈপ্লবিক বাড়াবাড়ি’-কে সমর্থন করতে চায় না, কারণ তাতে তার সামাজিক এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবার সুযোগ থেকে যায়। রাজনৈতিক-সামাজিক বা অর্থনৈতিক অবরোধকে এরা ঘৃণা করে, কিন্তু শ্রেণীগত ভাবে লড়াই করে না। মধ্যশ্রেণীর বরাবরের লক্ষ্য হল সমাজে এলিট হিসাবে নিজেকে গড়ে তোলা এবং তার জন্য আইনসিদ্ধ প্রশাসনিক পথ অবলম্বন করা। শ্রেণীগত ভাবে নিরাপত্তা লাভের জন্যে এদের মধ্যে দেখা দেয় প্রশাসনিক নির্ভরতা, আর তার ফলে  জন্ম হয় এক ধরণের উগ্র রাষ্ট্রমূখিনতার।  
এই জটিল গঠনের কারণেই এরা হয়ে ওঠে ফ্যাসিস্টদের ক্ষমতায় আনার প্রধান কারিগর। বিশেষ বিশেষ সময়ে, যখন পুঁজিবাদ প্রবল সংকটের মুখোমুখি হয়, বিপ্লবী সংগ্রাম খানিকটা মুখ থুবড়ে পড়ে, মধ্যশ্রেণীর জীবনের সুস্থতাবিঘ্নিত হয়, তখন তাদের সরকার বিরোধী আবেগকে ব্যবহার করে ফ্যাসিস্টরা। পাম দত্ত সঠিক ভাবেই বলেছেন, ‘Fascism in its inception commonly originates from middle-class (petit-bourgeois) elements, directs a great deal of its appeal to the middle class, to small business and the professional classes against the organised working class and the trusts and big finance, draws a great part of its composition, and especially its leadership, from the middle class, and is soaked through with the ideology of the middle class, of the petit-bourgeoisie under conditions of crisis.
যুদ্ধোত্তর ইতালি থেকে জার্মানি, দু জায়গাতেই মূলত মধ্যশ্রেণীর সমর্থনেই ফ্যাসিবাদ বিজয়ী হয়েছিল। তবে ইতিহাস প্রমাণ করেছে যে, যাদের ওপর ভর করে ফ্যাসিবাদ ক্ষমতায় আসে, পরে তাদের কতল করাই ফ্যাসিস্টদের চরিত্র, কারণ পুঁজির স্বার্থ রক্ষা করাই ফ্যাসিবাদের দর্শন। পচনশীল পুঁজিবাদের উগ্র ও সংগঠিত হিংসাত্মক শাসনের নামই ফ্যাসিবাদ এবং এই ব্যবস্থা বুর্জোয়া গণতন্ত্রের মধ্যে দিয়েই বিকশিত হয়। যে সমস্ত দেশে বুর্জোয়া গণতন্ত্রের একটা আবরণ থাকে এবং আধা-সামন্ততান্ত্রিক উৎপাদন সম্পর্ক ভালো মাত্রায় বজায় থাকে, সেখানেও সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির স্বার্থে ফ্যাসিস্ট শাসন দেখা দিতে পারে জমিদার-জোতদার শ্রেণীর সাথে মিলে মিশে। এই সব দেশে সমাজ সংস্কারের ফাঁকা বুলি কপচিয়ে ফ্যাসিস্টরা মধ্যশ্রেণীকে বশে আনে।
বাঙলার বুকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ফ্যাসিস্ট মঞ্চ তৃণমূল কংগ্রেস বড়ো বুর্জোয়া ও সামন্ত শ্রেণীর একনায়কতান্ত্রিক শাসন গড়ে তোলার চেষ্টা চালাচ্ছে। এদের উত্থানের পেছনে যেমন সুবিধাভোগী সিউডো-ইন্টেলেকচুয়ালরা রয়েছে, রয়েছে সাম্রাজ্যবাদী সাহায্য, বিভিন্ন দালাল গণমাধ্যমের অকল্পনীয় সহায়তা, তেমনই রয়েছে সাধারণ মধ্যশ্রেণীর একটা বড়ো অংশ। সাথে সাথে ফ্যাসিস্ট প্রোপাগান্ডার জোড়ে তৃণমূল প্রভাব বিস্তার করেছে খেটে খাওয়া মানুষের মধ্যেও। গত এক কি দেড় দশকে বাম আন্দোলন খানিকটা স্তিমিত হয়ে পরায় তাদের মধ্যে যে ক্ষোভ এবং সরকার বিরোধী অসন্তোষ দেখা দিয়েছে, তাকে কাজে লাগিয়ে ইতিমধ্যেই ওরা পঞ্চায়েতগুলোতে দখল নিয়েছে। সৃষ্টি করেছে এক আশংকাজনক পরিস্থিতি।
৭-এর দশকে যখন সিদ্ধার্থ রায়ের আমলে বাঙলায় আধা-ফ্যাসিস্ট শাসন কায়েম হয়েছিল, তখন নব-কংগ্রেসিরা শহরগুলোতেই ফ্যাসিস্ট সন্ত্রাস চালাত, গ্রামে সেরকম প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। কিন্তু এইবার ওরা গ্রামাঞ্চলেও নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। সিপিএম বিতরণের নামে পাট্টাধারী ও বর্গাদার কৃষকদের উচ্ছেদ করে গ্রামীণ জোতদার-জমিদার-ওয়ারলর্ডদের হাতে জমি তুলে দিচ্ছে। শিশির অধিকারী এবং শুভেন্দু অধিকারী নামক দুটো লুম্পেন ওয়ারলর্ড নিজেদের খাস হয়ে যাওয়া জমি-জিরেত উদ্ধার করতে নেমেছে। মানুষকে ব্যাপক ভাবে সন্ত্রস্ত করে বিধানসভায় ক্ষমতায় এসে বাঙলার মাটিকে শ্রমিক-কৃষক ও মেহনতি জনতার রক্তে রাঙিয়ে দিতে চাইছে ওরা। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নির্দেশে কম্যুনিস্টদের হত্যা করে বাঙলাকে ইন্দোনেশিয়া বানাবার তাল করেছে মমতা আর তার দলবল।
এই শক্তিকে আমাদের রাজ্যের মাটি থেকে উৎখাত করতেই হবে। ওদের মুদ্রাতেই ওদের উত্তর দিতে হবে। এই কাজের জন্যে দরকার ফ্যাসিস্টদের আসল চেহারাটা সাধারণ মানুষের সামনে পরিষ্কার ভাবে তুলে ধরা। ছাগলের চামড়াটা টেনে খুলে নেকড়েগুলোর আসল রূপটা জনতার সামনে প্রকাশ করে দেওয়া এবং দোদুল্যমান শ্রেণীগুলোকে নিজের পক্ষে জয় করে আনা। এছাড়াও প্রয়োজন শ্রমিক শ্রেণীর সাথে ঐক্যবদ্ধ হওয়া,  irrespective of political group or party.
ফ্যাসিস্টদের সাথে লড়াই করতে হলে শ্রমিক শ্রেণী ও তার সংগঠনগুলোকে আত্মরক্ষার সুপরিকল্পিত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ফ্যাসিবাদ যখনই হিংসাত্মক পথ নেবে, তখনই তা প্রতিরোধ করতে হবে প্রোলেতারিও হিংসার মাধ্যমে। শ্বেত সন্ত্রাসের একটাই উত্তরলাল সন্ত্রাস। অবশ্য এর মানে কখনই ব্যক্তি সন্ত্রাস নয়। শ্রমিক শ্রেণীর সংগঠিত শ্রেণী সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে যে বিপ্লবী হিংসা জন্মলাভ করে, তার দ্বারাই ফ্যাসিবাদকে সার্বিক ভাবে খতম করা সম্ভব। প্রয়োজনে এদের লাল সামরিক পথ ধরেই উৎখাত করতে হবে। এপ্রসঙ্গে কমরেড ক্লারা জেতকিনের এই ঐতিহাসিক বক্তব্য আমাদের স্মরণ রাখতে হবেOnly by instilling class-consciousness into the soul of every worker will we succeed in preparing also for the military overthrow of Fascism, which, at this juncture, is absolutely necessary.’ 

এই সংগ্রাম সফল হতে পারে একমাত্র শ্রমিক ও মেহনতি জনতার সার্বিক ঐক্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। জনগণের মুখের দিকে তাকিয়ে ক্ষুদ্র গোষ্ঠীবাদী মনোভাব থেকে সমস্ত কম্যুনিস্ট ও বামপন্থী শক্তিকে বেড়িয়ে আসতে হবে। গড়ে তুলতে হবে এক ঐক্যবদ্ধ বৃহৎ বাম ও গণতান্ত্রিক মঞ্চ।

No comments:

Post a Comment