ফ্যাসিবাদের
রাজনৈতিক প্রবণতাগুলোর মধ্যে অন্যতম হ’ল দলের অভিভাবককে কেন্দ্র করে মিথ নির্মাণ
করা এবং তার সাহায্যে জনগণের চিন্তাশক্তিকে পঙ্গু করে তাকে দেশের এবং জাতির
অভিভাবকে পরিণত করা। মুসোলিনি তো ফ্যাসিস্ট পার্টির নেপলস মহাসম্মেলনে ঘোষণাই
করেছিলেন যে বাস্তবে মিথ ব্যাপারটা সত্য না হলেও তার একটা বিশেষ গুরুত্ব আছে এবং
তা হোল মানুষের মধ্যে আবেগ এবং আশার সঞ্চার ঘটিয়ে তাকে ‘উদ্দীপ্ত’ করা। অর্থাৎ
জনগণের মাথাকে কন্ডিশন করো এবং তাদের হিস্টিরিয়াগ্রস্ত করে তোল। পরবর্তীকালে
হিটলারের জার্মান মুলুকেও এই একই ব্যাপার দেখা গেছে। আমরা দেখেছি কি ভাবে
জার্মানদের মুখে মুখে ফিরেছে হিটলারের নাম, কি ভাবে তৈরি করা হয়েছে ইহুদী ও
কম্যুনিস্ট বিরোধী গণ-হিস্টিরিয়া। কয়েক বছর আগে ঘটে যাওয়া গুজরাট প্রদেশের যে
গণহত্যার ছবি আমাদের মনকে আজও প্রতি মুহূর্তে বিষণ্ণ করে তোলে, তাও এই ফ্যাসিস্ট
প্রবণতারই ফলিত রূপ। আবেগের কৌশলী প্রয়োগের মাধ্যমে মানুষের যুক্তি বোধকে ভোঁতা
করে দেওয়াই ফ্যাসিস্ট মিথ-এর উদ্দেশ্য।
এখন
প্রশ্ন হল, নেতৃত্বের প্রতি যুক্তিহীন আবেগ কি করে সৃষ্টি করা যায়? উপায়
আছে—মিথ্যা, মিথ্যা এবং মিথ্যা! ক্রমাগত লাগামহীন মিথ্যাভাষণ। মিথ্যার আশ্রয় নিয়েই
ফ্যাসিস্ট নেতাদের খর্বকায় বাস্তবকে আমূল বদলে দিয়ে তাদের করে তোলা হয় মহামানব,
আরোপ করা হয় ঐশ্বরিক মাহাত্ম্য। ‘এরা সাধারণ নেতা নন, এরা মেসায়া, নবী’—এইটাই
ফ্যাসিস্টরা প্রচার করার চেষ্টা করে, আর তার জন্যে বিভিন্ন গালগল্প বানিয়ে রেডিও
এবং ফিল্মের যথেচ্ছ ব্যবহার করে। হিটলারের রক্ষিতা লেনি রাইফেনস্থাল-এর তৈরি
‘তথ্যচিত্র’ ‘ট্রায়াম্ফ অব দ্যা উইল’ দেখলে বিস্মিত হতে হয়, বোঝা যায় কিভাবে একজন
সাধারণ মানুষকে শুধু মিথ্যা প্রচারের মাধ্যমে করে তোলা যায় অসাধারণ! একটা সময়
ইতালি এবং জার্মানির রাস্তায় রাস্তায় থাকত মুসোলিনি এবং হিটলারদের বিশাল বিশাল
কাটআঊট। জীবনের সব দিক থেকে যারা বামন, তারা প্রচারের গুণে হয়ে উঠতেন
সর্বগুণসম্পন্ন রাষ্ট্র নায়ক।
ফ্যাসিস্ট
প্রচারের আরও একটা অব্যর্থ অস্ত্র হ’ল ধর্ম। ফ্যাসিস্ট নেতৃত্বকে ভগবানের দূত
হিসাবে সামনে আনার কাজটা একটা পর্যায়তে কাঁধে তুলে নেয় ধর্মগুরুর দল। মুসোলিনি
সম্পর্কে খোদ পোপ বলেছিলেন— ‘ঈশ্বর প্রেরিত মানুষ’।
জনগণের
চোখে নিজেকে অসামান্য প্রতিভাবান হিসাবে প্রচার করাও এক ধরনের ফ্যাসিস্ট প্রবণতা।
এই জন্যেই তার দেশের এবং বাইরের মানুষের সামনে মুসোলিনিকে তুলে ধরা হয়েছিল
‘রেনেসাঁ ম্যান’ হিসাবে। মুসোলিনির ছাত্র জীবনের দিকে তাকালে দেখা যাবে তিনি মোটেই
কিছু বিশাল মাপের ছাত্র ছিলেন না। সামরিক স্কুলেও তিনি কোন কৃতিত্ব দেখাতে
পারেননি। কিন্তু প্রচার করা হয়েছিল যে মুসোলিনি সব ব্যাপারেই ব্যতিক্রমী
প্রতিভাধর। তিনি লেখা-পরায় সরস্বতীর বরপুত্র, সামরিক বিদ্যায় এবং বীরত্বে
অ্যাপোলোর মতো শ্রেষ্ঠ। প্রচারের ঢং ছিল এতটাই চমৎকার যে লিউজি পিরানদেল্লো, এজরা
পাউন্ড থেকে রবি ঠাকুর অবধি কুপোকাত হয়েছিলেন। হিটলারের ছবি আঁকা নিয়েও একই কথা
বলা যায়। চিত্রকর হিসাবে তিনি ছিলেন নেহাতই চতুর্থ শ্রেণীর। কিন্তু গোয়েবলসীয়
প্রোপাগান্ডার জোড়ে তার স্থান হয়েছিল দ্যাভিঞ্চিদের পাসে। তৃতীয় রাইখ-এর যুগে
হিটলারের আঁকা কিছু অতি সাধারণ জলরঙের কয়েক লক্ষ কপি বানিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল
মানুষের মধ্যে। প্রচার করা হয়েছিল যে সেগুলো পৃথিবীর সেরা চিত্রশিল্পগুলোর
সমগোত্রীয়।
ওপরের
লেখায় যদি মুসোলিনি এবং হিটলারদের নামগুলো বদলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় করে দেওয়া হয়,
তাতেও তথ্যের খুব একটা হেরফের হবেনা।
মমতা
বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতন একজন বামনকে বাঙলার ত্রাতা হিসাবে চিহ্নিত করার জন্য
সাম্রাজ্যবাদের জারজ সন্তানকুল (বাজারি সাংবাদিকগুলোকে এর চেয়ে ভালো কিছু বলার মতো
বিশেষণ আমাদের অজানা) কোমর বেঁধে নেমে পড়েছে। হাতে ধরা চশমা এবং মোবাইল ফোনের ছবিও
প্রতিদিন এবাজার থেকে ওবাজারে উড়ে বেড়াচ্ছে। বুর্জোয়া সংবাদ মাধ্যমগুলোর একটাই
কাজ—মমতা কাল্ট তৈরি করা, দিনের পর দিন মিথ্যা খবর সরবরাহ করে সব দিক থেকে অযোগ্য
এবং অপদার্থ এক মহিলার গায়ে মুক্তিদাতার লেবেল সেঁটে দেওয়া। শঠতার প্রতীককে
প্রোপাগান্ডার জোড়ে সততার প্রতীক বানিয়ে দেওয়া।
যারা
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথাবার্তা একটু মন দিয়ে শুনেছেন, তারা সবাই বুঝতে পেরেছেন
যে সমাজ ও সভ্যতা সম্পর্কে ব্যঞ্জনবর্ণের কথা তো দূরে থাক, তার স্বরবর্ণের সাথেও
ওনার পরিচয় নেই। যা আছে তা হ’ল অবান্তর কথার চাটনি। এই চাটনি সম্বল করেই নেত্রী
সমাজ এবং মানুষ নিয়ে বই লেখেন। ফ্যাসিস্ট প্রচারের জোড়ে সেসব অপাঠ্য পুস্তক
বিক্রিও হয়। প্রচার সর্বস্বতা যুগে চটুল বুকনিবাজিতে অভ্যস্ত নেত্রী হয়ে ওঠেন
বুদ্ধিবৃত্তিকর।
আজেবাজে
বকলেও উনিই ঠিক (Mussolini
is always right), আর তাই তাকে বিশ্বাস করো, মেনে চলো, প্রতিষ্ঠা করার জন্য
লড়াই করো (believe,
obey and fight)—সোজা কোথায় নেতাকে পুজো করো (leader worship)।
গান্ধী ভবনে দাঁড়িয়ে যখন মমতা বলেন, জাতির জনক ডাণ্ডা নিয়ে চলতেন বলে তাঁর
অভিযানের নাম হয়েছে ডান্ডি অভিযান, তখন আমরা লজ্জায় নুয়ে পড়লেও তার স্তাবক
বুদ্ধিজীবীরা টু শব্দ করেন না। গান্ধীজীকে রবীন্দ্রনাথের লেবুর শরবৎ খাইয়ে অনশন
ভাঙ্গানর ইতিহাস (!) শ্রবণ করেও ওরা চুপ থাকেন। কথায় বলে ‘ছুঁচোর গোলাম চামচিকে,
তারও মাইনে চোদ্দ সিকে’। বিদ্বজ্জন নামক এই ছুছুন্দরদের চোদ্দ সিকের দায়।
শুধু
পুস্তক রচনা বা স্বরচিত ইতিহাসের চাটনিই নয়, নিজেকে ‘বীণাপাণি’ দেবীর মানসকন্যা
হিসাবে প্রমাণ করতে জাল বিশ্ববিদ্যালয়য়ের জাল ডক্টরেট সার্টিফিকেটও যোগার করেছিলেন
মুসোলিনির উত্তরসূরি। তবে বিচ
সরকে সেই জালিয়াতি ধরা পড়ে জাওয়ায় আর পরবর্তীকালে এই নিয়ে কথা বাড়াননি। খুব জানতে
ইচ্ছা করে— আজকাল যেগুলো লেখেন সেগুলো আসল তো?!
এতো
গুণের সমাহার যার মধ্যে, তিনি ছবি আঁকবেন না বা কবিতা লিখবেন না, এমন হয়? হ্যাঁ,
উনি ছবি আঁকেন (ভাগ্যিস পাসে সমীর এবং শুভা বাবুরা ছিলেন!), লাখ টাকা দরে তা
বিক্রিও হয়। কখন কখন আবার পুজো প্যান্ড্যাল-এর থিমও ঠিক করে দেন। আর কবিতা তো উনি
যখন তখন লিখে ফেলেন! কলম ধরলেই টুথ পেস্টের মতন কবিতা বেরোয়। তবে অধিকাংশ সময়েই
মাত্রা-ছন্দ দমবন্ধ অবস্থায় থাকার ফলে প্রুফ কারেকশনের দায়িত্বটা পড়ে বিশেষজ্ঞদের
হাতে। আগে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের দেখতেন। আজকাল সম্ভবত: জয় গোস্বামী এবং তরুণ
সান্যাল ভাগাভাগি করে দায়িত্ব সামলান।
ধর্মীয়
ভেক ধরার ব্যাপারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জুরি মেলা ভার। কখনও তিনি মাথায় কাপর
বেঁধে ধর্মপ্রাণ মুসলমান মহিলা, আবার কখনও তিনি গোরুর চোনা চেটে সাচ্চা হিঁদু,
কখনও বা মতুয়া সংঘের কর্মী। ধর্মের সাথে ফ্যাসিবাদের সম্পর্ক যে নিবির সেটা ভোটের
আগে নেত্রীর পাসে টিপু সুলতান মসজিদের ইমামের উপস্থিতি প্রমাণ করে দিয়েছে। মমতার
সম্পর্কে মুসলিম অধ্যুষিত গ্রামাঞ্চলে যে প্রচার চলছে তাও অভিনব! ‘দিদির সাথে
আল্লাহ্র যোগাযোগ আছে’—এটাই প্রচারের ধরণ। বার বার এই মিথ্যা বলে সাধারণ দরিদ্র
মানুষের যুক্তি বোধকে অসার করে তাদের বিশ্বাস করান হচ্ছে যে, উনিই সেই নেত্রী ‘whom providence has sent to us’।
ওপরের
আলোচনা থেকে পরিষ্কার যে তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক প্রবণতার সাথে ফ্যাসিস্ট
পার্টির রাজনৈতিক প্রবণতার যথেষ্ট সাদৃশ্য আছে। তবে তৃণমূলের খুদে ফ্যাসিস্ট
চরিত্র যদি আমরা ২ এবং ৩ এর দশকের ইউরোপের ফ্যাসিস্টদের সাথে সব দিক মিলিয়ে দেখতে
চেষ্টা করি তাহলে হিসাবে ভুল হয়ে যাবে। আমাদের মনে রাখা দরকার যে ‘কোন একটা দেশের
ঐতিহাসিক, সামাজিক ও অর্থনীতিক অবস্থা, ঐ দেশের জাতিয় বৈচিত্র্য আর আন্তর্জাতিক
অবস্থান অনুযায়ী পৃথক পৃথক দেশে ফ্যাসিবাদ আর তার সাথে ফ্যাসিস্ট একনায়কত্বের
বিকাশ পৃথক পৃথক রূপ গ্রহণ করে।’ ফলে যারা ভাবেন যে লগ্নিপুঁজির সাথে সংযুক্ত
হওয়ার ফলে ফ্যাসিবাদ শুধু সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোতেই দেখা দেবে, তারা এই মতবাদকে
খণ্ডিত ভাবে দেখেন।
তৃতীয়
আন্তর্জাতিকের সপ্তম কংগ্রেসের সমাপ্তি ভাষণে কমরেড দিমিত্রভ বলেছিলেন— ‘ঔপনিবেশিক
এবং আধা-ঔপনিবেশিক দেশগুলোতেও কিছু ফ্যাসিস্ট গোষ্ঠী দেখা দিচ্ছে, অবশ্যই সেখানে
জার্মানি, ইতালি আর অন্যান্য পুঁজিবাদী দেশে আমরা যেমনটা দেখতে অভ্যস্ত সেরকম কোন
সেরা ফ্যাসিবাদী দেখতে পাবার কোন প্রশ্ন ওঠেনা। এক্ষেত্রে যে বিশেষ অর্থনৈতিক,
রাজনৈতিক আর ঐতিহাসিক পরিস্থিতি অনুযায়ী ফ্যাসিবাদ তার নিজস্ব রূপ পরিগ্রহ করেছে
আর ভবিষ্যতেও করে চলবে তাকে অবশ্যই আমাদের পর্যবেক্ষণ করতে হবে ও মাথায় রাখতে
হবে।’ অতয়েব, যে দেশে সেই ভাবে নিজস্ব লগ্নিপুঁজির ব্যাপার নেই সেই দেশেও
ফ্যাসিবাদের উত্থান সম্ভব। ধরাযাক ভারতবর্ষ। একদিকে যেমন ভারতের বড়ো বুর্জোয়া
শ্রেণী অধিক পরিমাণে গাঁটছড়া বেঁধে চলেছে সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির সাথে, তেমন ভাবেই
সাম্রাজ্যবাদী লুণ্ঠনের ভিত্তি প্রস্তুত করে দিচ্ছে সামন্তবাদ। এই জন্যে ভারতের
বুকে যদি ফ্যাসিস্ট জমানা দেখা দেয়, তা হবে সাম্রাজ্যবাদের লেজুড় বড়ো বুর্জোয়া
শ্রেণী ও বৃহৎ ভূস্বামী শ্রেণীর মাধ্যমে, আন্তর্জাতিক পুঁজির পক্ষে। বাঙলার মাটিতে
মমতা আর তার চ্যালারা এইটাই করার চেষ্টা করছে। সংকটে পরা আন্তর্জাতিক পুঁজির
নির্দেশে বাঙলা, তথা ভারত থেকে বামপন্থাকে উৎখাত করতে নেমেছে তৃণমূল কংগ্রেস।
সঙ্গে পোঁ ধরেছে বিদ্বজ্জন নামক লালসাগ্রস্ত জীবগুলো।
কিন্তু
মমতা এবং তার পা-চাটুয়ারা জেনে রাখুন, বাঙলার জনতা জেগে উঠেছে। দিকে দিকে তাঁরা
প্রতিরোধ গড়ে তুলছেন। খুদে-ফ্যাসিস্টদের ক্ষমতা নেই একে রুখে দেবার।
মুসোলিনিদের পরিণতিটা
মমতা দেবী আর তার ফেউদের জানা আছে তো? সাবধান হোন, সাবধান!
No comments:
Post a Comment