Man's dearest possession is life. It is given to him but once, and he must live it so as to feel no torturing regrets for wasted years, never know the burning shame of a mean and petty past; so live that, dying he might say: all my life, all my strength were given to the finest cause in all the world- the fight for the Liberation of Mankind. - Nikolai Ostrovsky

Saturday, April 16, 2011

সেদিনের স্তালিনগ্রাদ, আজকের বাঙলা (সম্পাদকীয় 'এই তো সময়' প্রথম বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা, ১৭ই মার্চ, ২০১১)




২২শে জুন ১৯৪১। মলতভ-রিবেনট্রপ চুক্তি দু পায়ে মাড়িয়ে ঝরের বেগে ফ্যাসিস্ট বাহিনী আক্রমণ হানল সোভিয়েত ইয়ুনিয়নের ওপর। তড়িৎ গতিতে ঢুকে এলো তারা। সোভিয়েত নাগরিকদের রক্তে নিয়ে চলল হিটলার ও তার সাঙ্গপাঙ্গদের হোলি খেলা। গোটা বিশ্ব শিউড়ে উঠল ভয়ে! দুনিয়ার মুক্তিকামী জনতার একমাত্র ভরসাস্থল আক্রান্ত! এই ভয়ানক পরিস্থিতিতে ১৯৪১ সালের ৭ই নভেম্বর জনতার মুখোমুখি হলেন জোসেফ স্তালিন। সমস্ত পরাজয়বাদী চিন্তার বিরুদ্ধে একা দাঁড়িয়ে বজ্রকন্ঠে ঘোষণা করলেন—‘কমরেডস, গোটা পৃথিবী আজ আপনাদের দিকে তাকিয়ে আছে; তাঁরা মনে করেন আপনারাই হলেন সেই বাহিনী যা ঐ আক্রমণকারী জার্মান লুটেরাদের ধ্বংস করতে সক্ষম। ইয়োরোপের সেই পরাজিত মানুষেরা, যারা জার্মান হানাদারদের জোয়ালে আটকা পড়েছেন, আপনাদেরকেই তাঁদের মুক্তিদাতা বলে মনে করছেন। আপনাদের সবার কাঁধে ন্যস্ত হয়েছে দুনিয়াকে মুক্ত করার কাজ। এই কাজের যোগ্য হয়ে উঠুন!’ মহান স্তালিনের নির্দেশে নিজেদের প্রাণ তুচ্ছ করে নতুন উদ্যমে রণক্ষেত্রে এসে দাঁড়াল সোভিয়েত জনতা। হানাদারদের খতম করতে লালবাহিনী সূচনা করল ‘অপারেশন ইউরেনাস’-এর। শুরু হল মরণপণ লড়াই।
১৯৪২-এর ১৭ই জুলাই ফ্যাসিস্টরা পা রাখল স্তালিনগ্রাদে। নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-যুবক, সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে এলো পিতৃভূমিকে রক্ষা করতে। তার পর সে যেন এক রূপকথার কাহিনী! একটা পাঁচতলা বাড়ীর একতলা দখল করেছে ফ্যাসিস্টরা, শহরের ৯০%-ও তাদেরই দখলে, তবু আত্মসমর্পণ করছেনা স্তালিনগ্রাদ। একতলা দখল হয়েছে তো কি হয়েছে? দোতলায় তার মুহতোড় জবাব দিচ্ছে সাধারণ মানুষ। দন নদীর এক হাত নিচ দিয়ে ইস্পাতের পাত ফেলে জার্মানদের স্যাচুরেটেড বোম্বিং-এর হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করছে রুশ সৈন্য; আবার পরক্ষণেই ফ্যাসিস্টদের ওপর গেরিলা আঘাত হানছে, ট্যাঙ্ক নিয়ে চলে আসছে। পিতৃভূমির প্রতিটা ইঞ্চি জমির জন্যে লড়াই করছে স্তালিন-এর সন্তানরা। ১৯৪৩-এর ২রা ফেব্রুয়ারি, প্রবল রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে বিজয়ী হল স্তালিনগ্রাদ। আরও একবার প্রমাণ হল, ‘...পৃথিবীতে যত রকমের মূল্যবান পুঁজি আছে, তাঁর মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান... পুঁজি হল মানুষ’। স্তালিনগ্রাদের বিজয় ফ্যাসিবাদের কোমর ভেঙ্গে দিয়েছিল, লুটেরা জল্লাদের বিরুদ্ধে এটা ছিল বিশ্ব-জনতার রণনৈতিক উল্লম্ফন।
বাঙলার বুকে আজ হিটলার-মুসোলিনির উত্তরসূরিরা নৈরাজ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছে। দুচে, ফ্যুয়েররদের অনুকরণে দিদি। (‘হাইল হিটলার’ আর ‘জয় মমতা’ কোথায় যেন মিলে যায়!) ডিগবাজি খাওয়া রাজনীতিবিদ, গ্রাম বাঙলায় সামাজিক কর্তৃত্ব হারানো বদমায়েশ সামন্তপ্রভু, ৭’এর দশকের অত্যাচারী-খুনে পুলিশ অফিসার এবং আমলাদের নিয়ে, সাম্রাজ্যবাদী অর্থ সাহায্যে, গোড়ে উঠেছে একটা খুদে-ফ্যাসিস্ট মঞ্চ—তৃণমূল কংগ্রেস। পোঁচে যাওয়া জমিদার-জোতদার এবং গ্রামীণ ওয়ারলর্ডদের হৃত সামাজিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে নেমেছে ওরা। আগামী নির্বাচনে বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তিকে ধরাশায়ী করতে এদের সাথে জোট বেঁধেছে কংগ্রেস এবং মারকুটে ব্রাউনশার্ট মাওবাদীরা। সাম্রাজ্যবাদী অর্থের কল্যাণে ওরা গণমাধ্যমগুলোকে কিনে নিয়েছে। চারিদিক থেকে চালাচ্ছে বাম বিরোধী অপপ্রচার। বাঙলার গ্রামে গ্রামে ফ্যাসিস্ট হায়নারা ঘুরে বেড়াচ্ছে তাজা রক্তের সন্ধানে। প্রতিদিন প্রাণ দিচ্ছেন খেটে খাওয়া মানুষ। উচ্ছেদ হচ্ছেন হাজার হাজার পাট্টাধারী কৃষক। তৃণমূল কংগ্রেস একটা জিনিস খুব ভালো রপ্ত করেছে—এক মুহূর্ত খালি না রেখে সর্বক্ষণ মানুষকে শারীরিক এবং মানসিক ভাবে সন্ত্রস্ত করে যাওয়া।
জনগণকে সামগ্রিক ভাবে সন্ত্রস্ত করার সাথে সাথে মানুষের একটা অংশের সরকারবিরোধী ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে তৃণমূল ক্ষমতায় আসতে চাইছে। জনগণের আবেগকে নিজের কাজে লাগানো এবং ক্ষমতায় এলে একটাও প্রতিশ্রুতি পুড়ন না করা—এটাই হল ফ্যাসিস্টদের চরিত্র। ইতালিতে যখন মুসোলিনি ফ্যাসিস্ট পার্টি গঠন করেন তখন যে প্রধান দশ দফা কর্মসূচী ঘোষণা করা হয় তা বামপন্থী কর্মসূচী বললে অত্যুক্তি করা হয় না। কিন্তু ইতিহাস প্রমাণ করেছে যে এগুলো ওদের কাছে ছিল কেবল কথার কথা। মুসোলিনি থেকে মমতা— ওরা মুখে অনেক ভালো ভালো কথা বলে, কাজে করে ঠিক উল্টোটা, মানুষকে ঠেলে দেয় মৃত্যুর মুখে। প্রসূন দত্তর নির্মম পরিণতি চোখে আঙ্গুল দিয়ে এটা দেখিয়ে দিয়েছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতি সাম্রাজ্যবাদের নির্দেশ: আজ যেন তেন প্রকারে বাঙলায় ক্ষমতায় আসতেই হবে। উদ্দেশ্য: বামপন্থীদের সম্পূর্ণ ভাবে নিশ্চিনহ করা, হ্যাঁ, শারীরিক ভাবেও [আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন যে ফ্যাসিবাদ শুধু মাত্র কোন একক বাম দলের বিরুদ্ধেই সন্ত্রাস চালায় না, শ্রমিক শ্রেণীর সমস্ত সংগঠনকেই বিলুপ্ত করার রাস্তা খোঁজে; তাই যেসব বামপন্থী ভাবছেন, মমতা সরকারে এলে একা সিপিআই(এম)-ই মার খাবে এবং তাঁরা বিপ্লবী বাগাড়ম্বর চালিয়ে যাবেন, তাঁদের মস্তিষ্কের সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পাড়ে]। একমাত্র বামপন্থীদের ধ্বংস করতে পারলেই ভারতবাসীর বিমা ও পেনশনের টাকাগুলো ফাটকা বাজারে খাটিয়ে কবরের মুখে এসে দাঁড়ান পুঁজিবাদ অক্সিজেন পাবে। এন ডিল মারফৎ ভারতকে মার্কিন নয়া উপনিবেশে পরিণত করে নিজের দেশের বর্জ্যগুলো চাপিয়ে দেওয়া যাবে। 
যারা এই চরম নৈরাজ্য তৈরির কুমতলব করেছে, তাদের আজ আটকাতেই হবে। সমস্ত বামপন্থীদের কাছে আমাদের অনুরোধ— ক্ষুদ্র গোষ্ঠী-মানসিকতা ভেঙ্গে বেড়িয়ে আসুন; বাঙলার বুকে ৭২-এর ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাসের পুনরাবৃত্তি রুখতেই হবে। আসুন, সবাই একজোট হই; মমতা ও তার ফ্যাসিস্ট বাহিনীকে আর এগোতে দেবো না আমরা। আসুন, বলে উঠি ‘নো পাসারান’! আজ সংগঠিত হওয়ার সময় এসেছে। আসুন, সাম্রাজ্যবাদ ও তার সেবাদাস তৃণমূলী জল্লাদদের বাংলা, তথা ভারতের মাটি থেকে উৎখাত করি, গোড়ে তুলি প্রতিরোধ। আসুন, সাহসকে সবার ওপরে স্থান দিয়ে স্মরণ করি কমরেড ক্লারা জেতকিনের নির্দেশ: ‘Whenever Fascism uses violence, it must be met with proletarian violence.’ আসুন, প্রতিরোধের মহাকাব্য রচনা করি, বাঙলার বুকে সৃষ্টি করি আর এক স্তালিনগ্রাদ!

No comments:

Post a Comment