Man's dearest possession is life. It is given to him but once, and he must live it so as to feel no torturing regrets for wasted years, never know the burning shame of a mean and petty past; so live that, dying he might say: all my life, all my strength were given to the finest cause in all the world- the fight for the Liberation of Mankind. - Nikolai Ostrovsky

Wednesday, May 18, 2011

ছুঁচোর গোলাম - পর্যবেক্ষক ('এই তো সময়' প্রথম বর্ষ নবম এবং দশম ও একাদশ যৌথ সংখ্যা, ৫-১৯শে মে, ২০১১)



বুর্জোয়া গণমাধ্যমে ছুঁচোর কেত্তন চলবে। চলাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এবারের বিধানসভা ভোটে বামফ্রন্টকে হারাতে শুধু যে ছুছুন্দররাই দাপাদাপি করছে তা নয়, তাদের চাকরবাকররাও একেবারে কোমর বেঁধে নেমে পড়েছে (আত্মস্বার্থ বড় বালাই! নিমকহালালদের মধ্যে এখন জোর কম্পিটিশন)। কথায় বলে, ছুঁচোর গোলাম চামচিকে, তারও মাইনে চোদ্দ সিকে, হ্যাঁ, এই চামচিকেদের চোদ্দ সিকের দায়, আর তার প্রমাণ গত পনেরোই ফেব্রুয়ারি দৈনিক স্টেটসম্যান পত্রিকায় প্রকাশিত অধ্যাপক রণেশ রায়ের উত্তর সম্পাদকীয়।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কেন্দ্র করে বাংলার মাটিতে সামন্তশক্তির পুনরুত্থান ঘটানোর যে অপচেষ্টা চলেছে তার বিরোধিতায় স্বাভাবিকভাবেই সোচ্চার হয়েছেন রাজ্যের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন বাম ও গণতান্ত্রিক জনতা। নকশাল নেতা ও প্রখ্যাত চিন্তক আজিজুল হকও এর ব্যতিক্রম নন। বিপ্লব, মাওবাদ, ইত্যাদি বুলি কপচিয়ে যখন কিছু সুবিধাভোগী পরান্নজীবী মমতা এবং তার জল্লাদ বাহিনীর গোমস্তাগিরি করতে নেমেছে, তখন আর পাঁচজন গণতান্ত্রিক-চেতনাসম্পন্ন বামপন্থী মানুষের মতই আজিজুল হক এই অশুভ শক্তির বিরোধিতা করেছেন, টান মেরে বৃহন্নলা-মার্কা বিদ্বজ্জনদের ছদ্মবেশ ছিন্ন করেছেন। পত্র-পত্রিকা ও সভা-সমিতিতে আজিজুলের ক্ষুরধার ফ্যাসিবিরোধী বক্তব্যের ফলে একেবারে বিচ সড়কে কাপড়চোপড় খুইয়ে বিদ্বজ্জনদের বড় করুণ অবস্থা। যখন তখন দুঃশীল’ ‘হার্মাদরা টিটকিরি করে বলছে, ‘সুশীল বাবু, আপনার কাপড় কোথায়?’ রাগ হবে না কেন! এইভাবে প্রেস্টিজ পাংচার! ৭৬ সালে জেল ভেঙে এশিয়ার মুক্তিসূর্যের মুখে চুনকালি মাখিয়েও লোকটার শান্তি হয়নি! এখন এই আধা-পঙ্গু অবস্থাতেও কিনা কালীঘাটের খুদে মুসোলিনির বাড়া ভাতে ছাই দিচ্ছে, বুদ্ধিজীবীদের সাদাজামায় কাদা ছিটিয়ে খোরাক করছে! নাহ, সহ্য হয় না আর! আজ হয় এসপার নয় ওসপার!
কিন্তু এসপার-ওসপারটা হবে কী করে? যুক্তি চাই তো! অধ্যাপক মশাইয়ের তো কাক্কেশ্বরের চেয়েও খারাপ হালহাতে পেন্সিলটুকু নেই! কিন্তু ওই যে শুরুতে বললাম, আত্মস্বার্থ বড় বালাই! আজকের অধ্যাপক কালকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উঁচু অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ পদে যাবেন (উপাচার্য অনেক বড় ব্যাপার; নিদেনপক্ষে একটা ডীন হতে পারলেই বা মন্দ কি? এগুলোর কোনওটাই না হলে কোনও কলেজের প্রিন্সিপাল বা কোনও একটা কমিটির সদস্য...সোজা কথা কিছু একটা চাই!), এবং তার জন্য রেড়ী থেকে সর্ষে, সব রকম তেলই মজুত রাখতে হবে, ঘোমটা খুলে উঠোনে কোমরও দোলাতে হতে পারেঅতএব রেডি থাকতে হবে; নাহলে অন্য কেও দাঁও মেরে দেবে!

মুসোলিনির প্রসাদ পেতে ধূর্ত রণেশ রায় নেমে পড়েছেন আজিজুলকে মসীলিপ্ত করতে। মগজ খাটিয়ে কুযুক্তির জাল বিস্তার করেছেন। আজিজুল হকের বক্তব্যের অপব্যাখ্যা করেই ক্ষান্ত হননি, ছয়-সাতের দশকের রাজনৈতিক ইতিহাসকেও বিকৃত করেছেন। এছাড়া ব্যক্তিগত কুৎসা তো আছেই। যাইহোক, শেষ বিষয়ে রণেশবাবু যা লিখেছেন সেগুলো নিয়ে এই লেখায় জবাব দেওয়ার কোনও মানে হয় না। রাস্তায় গু-গোবর পড়ে থাকলে তাতে লাথি মারতে নেই। ওতে পাটাই ময়লা হয়। আজিজুল হকের বক্তব্যের মূল অর্থ এবং সেই সাথে ছয় এবং সাতের দশকের প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরাই এই লেখার উদ্দেশ্য। এই উদ্দেশ্য যদি না থাকত তাহলে রণেশবাবুর অপাঠ্য রচনা নিয়ে কাগজের অমূল্য কলাম নষ্ট করতাম না। তবে এর সাথে সাথে এইসব চার আনার সুশীলদের মানবদরদী সাজার ঝুটো কৌশলটাও উন্মুক্ত করে দেওয়ার দরকার আছে। সাধারণ পাঠকের জানা উচিত কাদের মায়ের বড় গলা!

কোন এক বহুল প্রচারিত কাগজে নাকি বলা হয়েছে, পশ্চিম মেদিনীপুরে কোনও এক সভায় আজিজুল হক বলেছেন, ‘ওই মহিলা কাপড় পরে আছে নেহাত অভ্যাস-বশত, নাহলে ওকে জঙ্গলেই ভাল মানাত।এই কথার উল্লেখ করে রণেশবাবু অভিযোগ করেছেন, আজিজুল হক তৃণমূল নেত্রীকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করেছেন এবং সেই সাথে জঙ্গল মহলের বসবাসকারী প্রান্তিক মানুষ ও আদিবাসীদের অপমান করেছেন। তর্কের খাতিরে এই উদ্ধৃতি সত্য বলেই ধরে নিচ্ছি। কিন্তু তাতেই বা কী প্রমাণ হয়? যে ভাবে অধ্যাপক মশাই এই কথাকে ব্যাখ্যা করেছেন তা গোয়েবলসীও জালিয়াতির এক আদর্শ উদাহরণ। বলা বাহুল্য, ওই সভায় আজিজুল হক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কোনও ব্যক্তিগত আক্রমণ করেননি, শুধু তাঁর নগ্ন রাজনীতিটা জনতার সামনে স্পষ্ট করে দিয়েছেন। তিনি ওই মহিলার উল্লেখ করেছেন তৃণমূলের দার্শনিক দিকটা বোঝাতেই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম ব্যবহার করা প্রসঙ্গে আজিজুল স্পষ্ট বলেছেন – ‘যেহেতু তিনিই তাঁর দলের মতাদর্শ, রাজনৈতিক লাইন, বিশ্ববীক্ষা, তাঁর এক অনুগামীর ভাষাতে গ্রহের ত্রাতা... এই জন্য নাম ধরেই লিখতে হচ্ছে। লেখাতে মমতা মানে সেই নীতি, আদর্শ এবং লাইন, ব্যক্তি নন’ (যে প্রবন্ধ থেকে এই উদ্ধৃতি দিলাম তা আজ থেকে দেড় বছর আগে প্রকাশিত হয়েছিল মতাদর্শে অগ্রণীপত্রিকায়)। আসলে তৃণমূল কংগ্রেসের ফ্যাসিস্ট পাশবিকতা এবং তাকে ঢেকে রাখার ধূর্ত রাজনীতির ব্যাপারটা বোঝাতেই কথাগুলো বলা। গায়ে ছাগলের চামড়া জড়িয়ে রাখলেও তৃণমূল কংগ্রেস দল যে হাড়ে-মজ্জায় ফ্যাসিবাদী, হায়েনার মতো হিংস্র, সেইটাই আজিজুল বলতে চেয়েছেন। জঙ্গলের নরখাদকরা যতই গলায় ময়দা ডলুক না কেন, তারা নরখাদকই থাকে। সাধারণ মানুষকে ধোঁকা দিয়ে ভোটে জিততে মমতা যে মানবদরদী মুখোশ পরেছেন, সেটা টান মেরে ছিঁড়ে দিয়েছেন আজিজুল, আর তাই রণেশ রায়ের মতো লোকদের এতো রাগ! আর এখানে হঠাৎ জঙ্গল মহলের মানুষের প্রতি অপমানের কথা আসে কোথা থেকে? রণেশবাবু কি আজকাল কিছু’ ‘সেবন-টেবনকরছেন?
ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে বামশক্তিকে আজিজুলের সমর্থনের ব্যাপারে সমালোচনা করতে গিয়ে সিপিএম-এর হার্মাদদের হাতে নন্দীগ্রামের মানুষের দুর্দশার কথা বলে রণেশ রায় নাকের জলে চোখের জলে এক হয়েছেন। তাপসী মালিকের ধর্ষণ নিয়েও বেশ আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছেন। আজিজুলের উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে দিয়েছেন ভৎসনা। নন্দীগ্রামের ঘটনা আমাদের সবার কাছেই প্রচণ্ড বেদনার, যন্ত্রণার। সাধারণ মানুষের জীবন চলে গেলে আমরা দুঃখ পাই কারণ মানুষ এবং একমাত্র মানুষই বামপন্থীদের অবলম্বন, সাথী। কিন্তু রণেশবাবু কী আমাদের জানাবেন কেন নন্দীগ্রামে শিল্প হবে না বলে মুখ্যমন্ত্রী জনসমক্ষে ঘোষণা করা স্বত্বেও তৃণমূলী-মাওবাদী নৈরাজ্য শুরু হল? কেন হাজার হাজার প্রান্তিক চাষিকে সিপিএম করার অভিযোগে উচ্ছেদ করা হল? আইনের শাসন ধ্বংস করে কেন সেখানে লাঠি গুলির মাওবাদী শাসন কায়েম করা হল? কিষানজী (নরখাদকটাকে জীবলতে প্রবৃত্তি হয়না যদিও) তো বেশ গলা চরিয়েই বলেছেন, নন্দীগ্রামে তৃণমূল তাদের অস্ত্র-শস্ত্র দিয়ে সাহায্য করেছে। কেন? ১৪ই মার্চ-এর আসল ঘটনা কী ছিল? রণেশবাবু তাপসী মালিকের কথা বলেছেন। কিন্তু আজ তো এটা প্রমাণিত যে এই ঘটনার সাথে সিপিএম-এর কোনও সম্পর্ক নেই। যে সিবিআই ইন্সপেক্টর এই কেসের তদন্ত করছিল সে তো নিজেই একটা আস্ত ঘুষখোর। মামলা চলছে লোকটার নামে। তাপসী মালিককে কারা খুন করেছিল সেটা একটু অনুসন্ধান করে দেখা হোক বরং।
নন্দীগ্রাম ও তাপসী মালিক ছারাও রণেশ রায় নেতাই এবং সূচপুর নিয়ে খুব দরদ দেখিয়েছেন। নেতাই এবং বাংলার বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে বসবাসকারী বামপন্থী প্রান্তিক মানুষকে যারা উচ্ছেদ করতে চাইছে, তাদের বিরুদ্ধে তাদের উপায়তেই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। হ্যাঁ, এইটাই গণতন্ত্র, আক্রান্ত মানুষের গণতন্ত্র! নেতাইয়ের মতো সূচপুরের ঘটনাও ছিল প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে জনতার প্রতিরোধী মেজাজের পরিচয়। হত্যাকারী এবং নরখাদকের অত্যাচারে সাধারণ গ্রামবাসী সেদিন প্রতিরোধে শামিল হয়েছিলেন। দিনের পর দিন কতো মার সহ্য করবেন সাধারণ মানুষ? রণেশবাবু, খুব তো কাঁদছেন নেতাইয়ের কথা বলে, তাপসী মালিকের কথা বলে, কিন্তু যখন শুভেন্দু অধিকারীর গুন্ডাবাহিনী এবং মাওবাদীরা মিলে গোটা পশ্চিম আর পূর্ব মেদিনীপুর জুড়ে চরম সন্ত্রাস চালাচ্ছিল তখন কোথায় ছিল আপনার কলম? মাওবাদীরা যখন সিপিএম করার অভিযোগে ২৯৪ জন প্রান্তিক কৃষক ও খেতমজুরকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল, নীলমণি টুডুর মতো সর্বজন-শ্রদ্ধেয় লোকশিল্পীকে খুন করে ফেলে রেখেছিল গ্রামের প্রান্তে, যখন বাড়ির লোক সিপিএম সদস্য হওয়ার জন্য ৮৬ বছরের বৃদ্ধকে ঘরে আটকে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যখন ২১ জন মাওবাদী বীরপুঙ্গব ICDS কর্মী ছবি মাহাতোকে হার্মাদ বলে অভিযুক্ত করে গোটা গ্রামের সামনে বলাৎকার করে জ্যান্ত কবর দিয়েছিল, তখন কোথায় ছিলেন আপনি? রণেশবাবু, একটু লজ্জা পান! দুটো কান না হয় কাটা গেছে, কিন্তু দেখতে তো পাচ্ছেন! একটু লজ্জা পান, একটু...
রণেশ রায় নামক এই তৃণমূলী দালাল এর পর নিজের ইতিহাস জ্ঞানের পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন। নকশাল আন্দোলনের ইতিহাসের আলোয় আজিজুল হকের কর্মকাণ্ড বিচার করতে গিয়ে চরম মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন যে CPI-ML সদস্য অগ্নি রায় এবং কমল সান্যালের হত্যায় আজিজুলের মদত ছিল। এটা একেবারেই তথ্যের অপলাপ। এম-এল পার্টির গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের জেরে শহীদ হয়েছিলেন অগ্নি রায় এবং কমল সান্যাল (টাটানগরের চণ্ডীর নামটা সম্ভবত রণেশ জানেন না, জানলে ওটাও নির্ঘাত আজিজুলের নামে চালিয়ে দিতেন)। কিন্তু সেখানে আজিজুল হকের যুক্ত থাকার প্রমাণ তিনি কোথায় পেলেন? এই দুজনকে যখন হত্যা করা হয় তখন তো উনি জেল-এ। এদের খুনের অভিযোগ যাদের নামে, তিনি তাদের কথা চেপে গেলেন কী করে? রণেশবাবু যখন CPI-ML-এর ইতিহাস এতটাই ভাল জানেন তখন তাঁর জানা উচিত ছিল যে এর সাথে আজিজুলের বিন্দুমাত্র সম্পর্কও নেই। অগ্নি রায় ও কমল সান্যাল হত্যা প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে CPI-ML নেতা খোকন মজুমদার বলেছেন, ‘...স্থানীয় দুজন পার্টি নেতা অগ্নি রায় ও কমল সান্যালকে খতমের লাইন সম্পর্কে প্রশ্ন তোলায় নিজেদেরই খতম হতে হয়েছে নিজেদের কমরেডের হাতে। আমি এসে তৎকালীন নেতা মহাদেব মুখার্জি ও দীপক বিশ্বাসকে চার্জ করি, ওরা কান্নাকাটি করে, পরে অবশ্য ত্রুটি স্বীকার করে।অগ্নি রায় ও কমল সান্যালকে হত্যা করার ব্যাপারে দীপক বিশ্বাসের নামে অভিযোগ করেছেন অপর এক নকশাল নেতা, ভোজপুর সংগ্রামের শহীদ জহর (সুব্রত দত্ত) – ‘...তিনি (চারু মজুমদার) পার্টির অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা বুর্জোয়া প্রতিনিধিদের অধিবিদ্যা, সংশোধনবাদী রাজনৈতিক লাইন আর বুর্জোয়া কাজের ধারার স্বরূপ উদ্ঘাটন করেন। সংশোধনবাদী পাণ্ডা দীপক বিশ্বাসের বন্দুক দিয়ে দুই লাইন চালানোর পদ্ধতির তিনি তীব্র নিন্দা করেন। এই পদ্ধতির পরিণাম-স্বরূপই ধানবাদের অসীম চক্রের একজন কর্মী ও দক্ষিণ কলকাতার দায়িত্বশীল কমরেড অগ্নি রায় ও কমল সান্যালকে হত্যা করা হয়।দুটো লেখা থেকেই এই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনায় একটা নাম অদ্ভুতভাবে উঠে আসছে দীপক বিশ্বাস, যার নামে অনেকে পরবর্তীকালে চারুবাবুকে পুলিসে ধরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ করেন। কিন্তু এই খুনের সাথে রণেশবাবু হঠাৎ আজিজুলকে কেন মেলাতে গেলেন? কুৎসা করলেও তো একটু বুঝেশুঝে করা উচিত। উনি কি মনে করেন CPI-ML-এর ইতিহাস উনি একাই জানেন?
লোক-কে যা ইচ্ছে তাই গিলিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে রনেশ রায় এতোটাই নিঃসন্দেহ যে তিনি মূর্খের মতো অভিযোগ করেছেনআজিজুল নিজের ওপর সিপিএম-এর অত্যাচারের কথা বলে অর্চনা গুহ এবং তার মতো আরও অনেক অত্যাচারিত মানুষের কথা ভুলিয়ে দিতে চেষ্টা করছেন। বলি ও রনেশবাবু, অর্চনা গুহর ঘটনা কোন আমলের? সিদ্ধার্থ জমানার কালো দিনগুলোতে (১৮ জুলাই ১৯৭৪) পুলিশ পুঙ্গব রণজিৎ গুহ নিয়োগী ও কনস্টেবল সন্তোষ দে নকশাল নেতা সৌমেন গুহর খোঁজ করতে গিয়ে অত্যাচার চালায় অর্চনা দেবী, তার ভাই সৌমেনের স্ত্রী লতিকা দেবী এবং আত্মীয়া গৌরির ওপর। ৭৭ সালে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় এলে এরা মুক্তি পান, এবং রুনু ও সন্তোষের নামে মামলা করেন। ২২ বছর ধরে কেস চলে। এর সাথে সিপিএম-এর হাতে অত্যাচারিত হওয়ার কি সম্পর্ক? রণেশবাবু যাদের হয়ে দালালি করছেন, অর্চনা দেবী-কে তো তারাই অত্যাচার করেছিলেন!
বিভিন্ন সভা সমিতিতে আজিজুল যখন বলতে যান, তখন মানুষ স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন করেন, আপনি তো নিজে সিপিএম-এর হাতে নির্যাতিত; তাহলে আপনি কেন আজ এদের হয়ে কথা বলছেন?’ এতে আজিজুল স্পষ্ট উত্তর দেন— ‘হ্যাঁ, জীবিতদের মধ্যে সিপিএম-এর হাতে আমার চেয়ে বেশি অত্যাচারিত এবং অবরুদ্ধ মানুষ আর কেউ নেই। কিন্তু যখন দেখি যে সরকারে থাকা সত্ত্বেও এদের ৪০০ জন কর্মী একদল নরপিশাচের হাতে খুন হয়েছেন, যার মধ্যে ৩২৬ জনই একেবারে প্রান্তিক খেটে খাওয়া মানুষ, এবং এই দলের ক্যাডাররা শুধু মাত্র শান্তিনিকেতনি স্টাইলে দরখাস্ত বিছিয়ে চলেছেন, তখন অবাক লাগে! যখন দেখি যে একটা রাজ্যের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিশ্ব-পুঁজিবাদ ঐক্যবদ্ধ হয়ে বাঙলা থেকে বামপন্থীদের উৎখাত করতে নেমেছে, তখন মনে হয় এদের মধ্যে নিশ্চয়ই ভালো কিছু একটা আছে। পৃথিবীর কোন কৃষক আন্দোলনে প্রান্তিক কৃষককে মরতে হয়েছে? ঘর ছাড়া হতে হয়েছে? লাল পতাকা পুড়েছে? লড়াইটা লাল পতাকা-কে রক্ষা করার।লাল পতাকা-কে নিশ্চিহ্ন করার জন্যেই মমতা নিয়োগ করেছে রণেশ রায় মার্কা লালসাগ্রস্ত বুদ্ধিজীবীদের।
বাঙলার মাটিতে আধা ফ্যাসিস্ট রাজ কায়েম করার চক্রান্তকে রুখতে আজিজুল যা করেছেন এবং পালা বদলের পর এই নৈরাজ্যময় সময়ে দাঁড়িয়েও যা যা করছেন তা দিমিত্রভ এবং চারু মজুমদারের শিক্ষার সাথেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাঁর শেষ লেখায় চারুবাবু বলেছিলেন— ‘আজ আমাদের কর্তব্য হচ্ছে... লড়াই-এর ভিত্তিতে জনগণের ব্যাপকতর অংশের সঙ্গে যুক্ত মোর্চা প্রতিষ্ঠা করা... আজ বামপন্থী দলগুলো সাধারণ মানুষের প্রতি যে অত্যাচার কংগ্রেস চালাচ্ছে তার বিরুদ্ধে লড়াই করতে নেতৃত্ব দিচ্ছে নাসেই সমস্ত দলগুলোর মধ্যেকার শ্রমিক-কৃষক জনগণের তাঁদের দলের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ রয়েছেঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের ভিত্তিতে আমাদের তাঁদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হবার প্রচেষ্টা চালাতে হবেএমনকি যারা একসময়  আমাদের প্রতি শত্রুতা করেছে, বিশেষ পরিস্থিতিতে তারাও আমাদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হতে এগিয়ে আসবেএইসব শক্তির সাথে ঐক্যবদ্ধ হবার মতো মনের প্রসারতা রাখতে হবেমনের প্রসারতা কমিউনিস্টদের গুণ  আজিজুল হক চারু মজুমদারের শ্রেষ্ঠ সৈনিকদের অন্যতম। তিনি সৃজনশীলতার সাথে এই শিক্ষাই প্রয়োগ করছেন, ফ্যাসিস্ট দস্যুদের পথ আটকে চিৎকার করে উঠেছেন নো পাসারান
মমতা ব্যানার্জীর পা চাটতে গিয়ে রণেশ রায় নিজেকে গোয়েবলস-এর উত্তরসূরি হিসাবে মেলে ধরেছেন। তাঁর অভিযোগ— ’৭০-এর দশকে সৌরেনবাবু, সুশীতলবাবু এবং বহু নিষ্ঠাবান নকশালপন্থী ব্যক্তিহত্যার রাজনীতির বিরোধিতা করেন, সবাইকে বিতর্কে আহ্বান জানান তখন মহাদেববাবুকে বিপ্লবের কর্তা বানিয়ে ব্যাক্তিহত্যার লাইনকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেনআজিজুল। সত্যি কথা বলতে কি, এই লাইনগুলো পড়তে পড়তে হতবাক হয়ে যেতে হয়! একজন অধ্যাপক, যিনি নাকি ভবিষ্যতের জাতি গঠনের কারিগর, তিনি এতো মিথ্যা কথা বলেন কি করে! ৭০-এর শুরুর দিকে মূর্তি ভাঙ্গা ও ছাত্র-যুবদের শহরকেন্দ্রিক অ্যাকশন-এর বিষয়কে কেন্দ্র করে সুশীতলবাবুর সাথে পার্টি লাইনের কিছু তফাত দেখা দেয়। তিনি রাজ্য কমিটিতে এই নিয়ে দলিল দেন, কিন্তু পার্টির অফিশিয়াললাইনের সামনে তা পরাস্ত হয়। এর পর তিনি স্বেচ্ছায় রাজ্য সম্পাদকের দায়িত্ব ছেড়ে দেন এবং হুগলী জেলায় নিজের লাইন অনুশীলন করতে থাকেন। হুগলীতে থাকার সময় তিনি চারু মজুমদার-এর খতমের লাইন-এর অতিবামপন্থী বিচ্যুতির কথা উল্লেখ করে দলিল লেখেন এবং হঠকারী রাজনীতিপ্রতিহত করার কথা বলেন। এই সময় সুশীতলবাবুর বিরুদ্ধে যিনি সবচেয়ে বেশী সোচ্চার ছিলেন, তাঁর নাম সৌরেন বসু। শোনা যায়, রাজ্য কমিটির মিটিং-এ তিনি সুশীতলবাবুকে পার্টি থেকে বহিষ্কারের দাবীও তুলে ছিলেন! সৌরেন বসু তাঁর লাইন পরিবর্তন করেন জেল-এ যাওয়ার পর, এবং তার প্রথম প্রকাশ ঘটে চৌ এনলাই-এর ১১দফা উপদেশ-এর ভিত্তিতে জেল থেকে লেখা ছয় নেতার খোলা চিঠিমারফৎ (১৯৭৩)। এই চিঠিতে সৌরেনবাবু চারু মজুমদার-কে সম্পূর্ণ ভাবে নস্যাৎ করেন। চৌ এনলাই-এর বহু কথাও এই চিঠিতে চেপে যাওয়া হয়। এমতাবস্থায় যখন পার্টির অধিকাংশ নেতা হয় জেলে রয়েছেন নয়তো দল ত্যাগ করেছেন, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য জগজিৎ সিংহ সোহাল বা শর্মা পশ্চিমবাংলা রাজ্য কমিটির নেতা মহাদেব মুখার্জীর সাথে পাঞ্জাবের রোপার জেলায় মিলিত হন এবং পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠন করেন। জহরের নেতৃত্বাধীন বিহার রাজ্য নেতৃত্বকারী টিম একে সমর্থন করেন। ৭৩ সালে চিন পার্টির দশম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হলে এই কেন্দ্র ভেঙ্গে যায় এবং মহাদেববাবুর নেতৃত্বে সংগঠিত হয়। এই গোটা ঘটনায় আজিজুলের ভূমিকা কি ছিল? আজিজুল সেই সময় ছিলেন জেল পার্টি কমিটির নেতা। জেলের ভিতরে যখন একদল লোক ভুল শুধরে নেওয়ার নামে চারু মজুমদার এবং পার্টির অফিশিয়াল লাইন-কে ধ্বংস করে ফেলতে উদ্যত হন, তখন তার বিরুদ্ধে আজিজুল হক এবং নিশীথ ভট্টাচার্য তীব্র তাত্ত্বিক সংগ্রাম পরিচালনা করেন। লিন পিয়াও প্রশ্নেও তাঁরা চিন পার্টির সমালোচনা করেন। কিন্তু এর সাথে সমস্ত বিতর্ক এড়িয়ে আজিজুলের মহাদেববাবুকে নেতা বানিয়ে ব্যাক্তিহত্যার লাইনকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা রণেশ রায় কোথায় দেখলেন? জেল থেকে ৭৭ সালে বেরোবার পর তো আজিজুল-ই সেই মানুষ যিনি মহাদেব মুখার্জীর সুবিধাবাদী রাজনীতিকে এক্সপোজ করে দেন এবং নিশীথবাবুর সাথে সিপিআই-এম এল দ্বিতীয় কেন্দ্রীয় কমিটিগড়ে তোলেন। মমতার গোমস্তা রণেশ রায় কি ভাবছেন ৭২ পরবর্তী ইতিহাসের ঠেকা তিনি একাই নিয়ে বসে আছেন?
আরও একটা মজার ব্যাপার এই যে, রণেশ রায় তাঁর লেখায় কোথাও চারু মজুমদারের নাম করেন নি। এটা কি নিছক বাদ পড়ে যাওয়া? না, তা নয়। এখানেই এই অধ্যাপকের আসল বজ্জাতিটা লুকিয়ে আছে। রণেশ রায় আসলে ছলে বলে কৌশলে চারু মজুমদার-কেই অস্বীকার করতে নেমেছেন। কিন্তু মুখে সেই কথা বলার হিম্মৎ নেই তাঁর। তাই চলছে সার্কাস-এর দড়ির খেলা! কিন্তু রণেশবাবু ভুলে গেছেন যে এসব বজ্জাতি বেশী দিন ধোপে টেঁকে না।
এর পর রণেশ রায় মাওবাদী-তৃণমূলী জোট-কে ইনিয়েবিনিয়ে সমর্থন যোগানর চেষ্টা করেছেন। আমাদের কাগজে এই নিয়ে আমরা বহু বার আগে আলোচনা করেছি, তাই আর নতুন করে এই প্রসঙ্গ উত্থাপনের কোনও প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। তবে তৃণমূল-মাওবাদী যোগাযোগের ব্যাপারে রণেশবাবু যদি পিসিসি নেতা সন্তোষ রানার সাথে যোগাযোগ করেন তাহলে অনেক তথ্য পাবেন বলেই আমাদের বিশ্বাস। কিভাবে তাঁর ক্যাডার-দের জোর করে তৃণমূলে যোগদান করতে বলেছিল মাওবাদীরা, তাও জানতে পারবেন।

বাংলার মাটিতে ফ্যাসিস্ট সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেই সরকারের পা-চাটা দালালদের সবার চিনে নেওয়া উচিৎইতিহাস এদের ক্ষমা করবে না, মুখে থুতু দিয়ে যাবে আগামী প্রজন্ম!

6 comments:

  1. দুর্দান্ত লেখা। ক্ষুরধার এবং সময়োপযোগী। লাল সেলাম।

    ReplyDelete
  2. "রাজ্যের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন বাম ও গণতান্ত্রিক জনতা" tar maane Baam era gonotantrik noy :D :D lekhok er khubi sohoj swikarokti

    ReplyDelete
  3. pathoker bangla bhashagyan dekhe lekhok obibhuto! :D

    ReplyDelete
  4. Lekhok er buddhidipto chinta-bhabna dekhe amio obhibhuto :D :D

    ReplyDelete
  5. প্রথমেই লেখককে অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা জানাই লেখাটির জন্য। রনেশের মত 'ছুঁড়ে দেওয়া হাড্ডি তে প্রতিপালিত' জীব দের প্রতি কোন নিন্দাই যথেষ্ট নয়।

    "রাজ্যের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন বাম ও গণতান্ত্রিক জনতা" এর অর্থ যদি বাম জনতা মানে গণতান্ত্রিক নয়, এই দাঁড়ায়, তাহলে কিছু ছুঁচোর গোলামের জন্য বাংলা অভিধান নতুন করে লেখাটা জরুরী হয়ে উঠেছে।

    ReplyDelete
  6. হতাশায় অটো খোরাক।

    যেমন গুরূ।

    তেমন চেলা।

    ReplyDelete