১৯৭১ সালের ৫’ই অগাস্ট। ভোরের
আলো ফুটতে দেরি আছে তখনো। এরিয়ানস্ ময়দানের এক কোণায় এসে দাঁড়ালো একটা জীপ—আলোটা নেভানো। জড়ানো গলায় কাউকে নামতে বলা হলো। খানিক ধ্বস্তাধ্বস্তি,
জোর করে চেপে দেওয়া কিছু অস্ফু্ট ‘লাল’
স্লোগান। তারপর সব ঠান্ডা–নিথর-নিস্তব্ধ। একটা
ক্ষীণকায় মানুষ conscious জগতের ওপারে গেলো এইমাত্র।
শশাঙ্কর শক্ত চোয়াল এখন আরো শক্ত—দাঁতে দাঁত বসে গেছে
আলিগড়ি তালার মতো—মুখ থুবড়ে পড়ে আছে মাটিতে। ময়দানের
সবুজ ঘাস হাঁ করে গিলছে লালচে পিগমেন্ট। জনৈক মত্ত পুলিস-পুঙ্গব (তারাপদ বোস) টলমলে পায়ে এগিয়ে গেলেন। ঘন ঘন নিঃশ্বাস পড়ছে—শিশির ভেজা পরিবেশে ছড়িয়ে যাচ্ছে বিলিতি দারুর পার্টিকল্। পড়ে থাকা
মানুষটার মাথাটা কেটে কালী-করাল (মস্তিষ্ক-যুক্ত ছিন্নমস্তাও হতে পারে) পোজ নিয়ে
রাম-রুনু-বিভূতিদের দিকে তাকিয়ে ঘোষণা করলেন, ‘শাল্লা,
সরোজ দত্তকে দিয়ে আজ কলকাতার বুদ্ধিজীবী খতম আরম্ভ করলাম। যার যার
গায়ে শালা একটু বামপন্থী গন্ধ পাবো, তাকেই এই ভাবে খতম
করবো!’
মধ্যরাতে ময়দানে হাওয়া
খেতে গিয়ে নায়ক দেখলেন সব। সেইদিন দুপুরে শুটিঙের ফাঁকে জনৈক্ সহ-অভিনেতার কাছে
জানতে চাইলেন, ‘সরোজ দত্ত কে রে?’ বিমলরা চিরকালই ওরাওঁদের মধ্যে
নিজেদের সাব্লাইম এক্সট্রীম কে খুঁজে ফেরে—ঘটনাটা শুনে
সম্ভবতঃ পুরনো দিনের IPTA-এর কথা মনে পড়ে গেছিল তাঁর।
আত্মপরিচয় গোপন রেখে ১৯৭১-এর ৫’ই নভেম্বর ‘বাঙলাদেশ’ পত্রিকাতে নায়কের বাঙলা ছাড়ার নেপথ্য
কাহিনী বিবৃত করলেন তিনি। গোটা ঘটনাটাই তুলে ধরলেন সাধারণ পাঠকের সামনে। শিউরে
উঠলাম আমরা! কি আর করা যাবে, মূর্খ জনতা তো আর জ্যোতি বাবুর
মত প্র্যাগম্যাটিক মানুষ নয় যে বলবে, ‘ও তো হয়েই থাকে!’ যাইহোক, চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ করতে গেলে সবার আগে
গাঁধী’জীর বাঁদর সাজতে হয়—নায়ক হবার
পর তো আর বীরেশের সাথে গেট মীটিঙে যাওয়া চলে না! স্বাভাবিক ভাবেই অ্যান্টিথিসিস
পড়ে গেল তার কিছুদিনের মধ্যে। কিন্তু দ্বান্দ্বিক-বস্তুবাদ বড় রসিক পুরুষ—ইতিহাসের চেয়েও! অ্যান্টিথিসিসের negation সেদিনই
হয়ে গেছিল। প্রাণপণে চেপে রাখতে চেয়েও গোটা বাঙলা তথা ভারত জুড়ে ছড়িয়ে
পড়েছিল পুলিসি রান্নার গন্ধ। গ্যাঁজলা তুলে ‘উনি ফেরার,
উনি ফেরার!’ বলে চিৎকার করেও তাই ম্যানেজ
দেওয়া যায়নি। তবে এটা ঘটনা, আমরা বড়ই সহনশীল; নাহলে সিদ্ধার্থ-প্রিয়-সুব্রত’র মত মহামহিমরা এখনো
বহাল তবিয়তে টিকে থাকেন!
সরোজ দত্ত শহীদ হবার পর
প্রায় চার দশকের কাছাকাছি সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। সিদ্ধার্থ-জমানা আজ ইতিহাসের
ফুটনোটে, আর রবীন দেবের ভাষণে সীমাবদ্ধ। বোধিবৃক্ষের ফল লাভ করে আজ সিংহাসনে আসীন
ভগবান বুদ্ধ। ’৭৭-এ, তাঁর মৃত্যুর
তদন্তের কথা বলে ভোট কুড়িয়েছিলেন, ক্ষমতার চেয়ারে বসে
ফাইল না পাওয়ার অছিলায় এখন তিনি শিল্পায়নে মত্ত—কে ফালতু
ভাববে একটা petty জার্নালিস্ট-কবি-অনুবাদকের কথা? মৃত্যুর এত বছর পরেও ‘সরোজ দত্ত’ একটা নিষিদ্ধ নাম। বাজারে তাঁর বই পাওয়া যায়—সভা-সমিতিতে
তাঁর কবিতাও পড়ে চোঙা-প্যান্ট পরা ‘red radical’-এর দল,
কিন্তু কোথাও যেন একটা প্রচ্ছন্ন বাধা আছে—কিছু
একটা…
১৩২১ বঙ্গাব্দের ২১’শে ফাল্গুন সরোজ
দত্ত জন্মগ্রহণ করেন অবিভক্ত বাঙলার (অধুনা বাঙলাদেশের) যশোর জিলার নড়াইল মহকুমার
বিখ্যাত দত্ত পরিবারে। তাঁর বাবার নাম হৃদয়কৃষ্ণ দত্ত, মা
কিরণবালাদেবী। নড়াইলের ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে
ম্যাট্রিকুলেশন পাস করার পর ১৯৩০ সালে কলকাতায় আসেন স্কটিশ চার্চ কলেজে
ইন্টারমিডিয়েট পড়তে। ওই একই কলেজ থেকে ১৯৩৬ সালে ইংরাজি নিয়ে সাম্মানিক স্নাতক
হন এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর পাঠক্রমে ভর্তি হন। কলেজে থাকতেই
কম্যুনিস্ট পার্টির গণসংগঠনে যোগদান করেন এবং কিছুদিনের কারাবাস ভোগ করেন। ১৯৩৮
সালে M.A. পাস করার পর তিনি যোগদান করেন প্রগতি লেখক সঙ্ঘে।
পরের বছর, ১৯৩৯-এ, আশুতোষ কলেজ হলে প্রগতি লেখক সঙ্ঘের দ্বিতীয় অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।
সেখানে কবি বুদ্ধদেব বসু ও সমর সেন যথাক্রমে, ‘Bengali Literature Today:
Position of Modern Writers’ এবং ‘In Defence of Decadents’ রচনা দুটি পাঠ করেন। ‘অগ্রণী’ পত্রিকার
পাতায় সরোজ দত্ত এর উত্তর দেন। ‘ছিন্ন করো ছদ্মবেশ’ এবং ‘অতি আধুনিক বাঙলা কবিতা’ শিরোনামে
লেখা প্রবন্ধে প্রগতিশীলতার ছদ্মবেশে ধেয়ে আসা বুর্জোয়া এলিটিজম-কে আক্রমণ করেন
তিনি। সমর সেনের সাথে এই বাদ-প্রতিবাদ অনেকদূর গড়ায়। এই সময় থেকেই সরোজ দত্তর
কবিতা প্রকাশ হতে শুরু করে। ১৯৩৯ সালে সহ-সম্পাদক হিসাবে যোগ দেন অমৃতবাজার
পত্রিকাতে। ১৯৪০-এ তাঁর লেখা দুটি গানের রেকর্ড প্রকাশিত হয়, যার গায়ক ছিলেন সুধীন চট্টোপাধ্যায়।
সামনের দিকে এগিয়ে যাবার
আগে শিল্প-সাহিত্য বিষয়ে সরোজ দত্তের ধ্যান-ধারণার নিয়ে স্বল্প-পরিসরে আলোচনা
করে নেওয়া দরকার।
‘In Defence of Decadents’ বা ‘অবক্ষয়বাদীদের
সমর্থনে’ রচনায় সমর সেন মশাই অনেক শব্দ খরচ করে, উৎপাদন-এর শক্তি ও উৎপাদন সম্পর্কের প্রশ্নকে সামনে
রেখে অসাধারণ চাতুর্যের সাথে তুলে ধরেছিলেন— যেহেতু অবক্ষয়
বিষয়টা বুর্জোয়া সমাজের একটা বাস্তবতা, অতএব একে সমালোচনা
বা তিরস্কার না করে শুধুমাত্র চিত্রিত করাটাই প্রগতিশীলতার পরিচয়ক। বলা বাহুল্য,
এই এলিওটিয় মতামতকে সরোজ দত্ত সমর্থন করতে পারেননি। কার্ল রাডেকের
মতই এলিওটপন্থীদের মধ্যে তিনি দেখেছিলেন ফ্যাসিবাদের ছায়া। তবে, এই ক্ষেত্রে উল্লেখ করা দরকার, এলিওট-কে ফ্যাসিবাদী
বলাটা oversimplification; তিনি নিতান্তই একজন ‘রানিং কমেন্টেটর অব ডেকাডেন্স’। যাইহোক, শিল্পের একটা
সোশ্যাল কমিটমেন্ট থাকে সব সময়ই। তার কাজ শুধুমাত্র সমাজের আয়না হয়ে ওঠা নয়,
তার কাজ সমাজ কে গঠন করা, এবং সেই ক্ষেত্রে
ডেকাডেন্ট সমাজের বাই-প্রোডাক্টগুলোর স্থান যে বিপ্লবী বা প্রগতি আন্দোলনে সহায়ক
নয়, বরং চুড়ান্তভাবে ক্ষতিকারক, এটা
না বললেও চলে। ডেকাডেন্সের অবশেষটাকে ছুঁড়ে ফেলেই প্রগতির পথে যাত্রা সম্ভব।
পুরনো জন্মদাগগুলো এগিয়ে চলার ক্ষেত্রে অন্তরায় ছাড়া কিছুই নয়।
সরোজ দত্তর কবিতার
বিষয়েও দু-চারটে কথা বলা দরকার। বিনয় ঘোষ তাঁর ‘সাম্প্রতিক বাঙলা কবিতা’ প্রবন্ধে সরোজ দত্তর কবিতার বৈপ্লবিক স্বরূপ, তার
ছন্দবদ্ধতা, শব্দের ঋজু ব্যবহার, আবেগের
বুদ্ধিদীপ্ত সংমিশ্রণ, ইত্যাদির প্রশংসা করে তাঁকে অন্যতম
শ্রেষ্ঠ কবি হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন - ‘ভবিষ্যতে মানুষের
মহাতীর্থ গঠনের স্বপ্নে মশগুল তরুণ কবি সরোজ কুমার দত্ত প্রাক্তন সংস্কৃতি এবং
সাহিত্য থেকে সাম্যবাদী এমন সব উপাদান শ্রদ্ধার সঙ্গে সংগ্রহ করে আত্মসাৎ করবেন
যাতে ভবিষ্যতের ভিত গঠনের কাজ সুসম্পন্ন হয়। …তাঁর কবিতার
সুগভীর ছন্দ শুধু বাঙলার সংস্কৃত-পন্থী কবিদেরই স্মরণ করিয়ে
দেয় না, অমিত্রাক্ষর ছন্দেও তিনি মাইকেলি ভঙ্গি বজায় রেখে
স্বকীয়তার প্রমাণ দিয়েছেন। শব্দগুলো তাঁর যেমন কাঠিন্যে উজ্জ্বল, তেমনি নিবিড় আবেগে কম্পমান, তাদের সম্মিলিত সুর
দীপ্ত কন্ঠের ঘোষণার মত শোনায়।’
ফর্মের দিক থেকে সরোজ
দত্ত কোন ভাঙচুর করেননি। সহজ সরলভাবে কথার পিঠে কথা সাজিয়ে মাত্রা, অক্ষর, সুর আর ধ্বনির উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রেখে ক্লেদমুক্ত নতুন সমাজ গঠনের কথা
বলেছেন। প্রশ্ন জাগে, যাঁর কলমের উপর নিয়ন্ত্রণ ছিল
ঈর্ষণীয়, তিনি কি এই ফর্ম ভাঙার কাজটা করতে পারতেন না?
প্রয়াত কবি বীরেন্দ্রনাথ রক্ষিতকে একবার এই বিষয়ে জিগ্যেস করাতে
তিনি হেসে স্মৃতির পাতা উলটে একটা গল্প শুনিয়েছিলেন— ‘তখন
আমি ছাত্র। বিভিন্ন কাগজে কবিতা বেরোতে শুরু করেছে। আমরা কয়েকজন একদিন ‘স্বাধীনতা’র [অবিভক্ত কম্যুনিস্ট পার্টির পশ্চিমবঙ্গ
কমিটির মুখপাত্র – লেখক] অফিসে গেলাম লেখা জমা দিতে।
সরোজবাবু বসে ছিলেন। এডিটোরিয়াল বোর্ডের সদস্য ছিলেন তখন। আমার লেখা দেখে বললেন,
‘ভালই তো লেখ, কিন্তু এই ভাষা, এই ধরনের শব্দের ব্যবহার তো এই পত্রিকার পাঠকের জন্যে নয়। সহজ কথাটা
সহজভাবে বল। আমাদের পাঠকরা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ, তারা
ফর্মের অত প্যাঁচ-পয়জার নিয়ে মাথা ঘামান না’।’
সরোজ দত্ত সহজভাবে
মানুষের কথা বলতে চেয়েছিলেন—পৌঁছতে চেয়েছিলেন সাধারণ মানুষের মননে। মাও-এর মতই
তিনি ট্র্যাডিশনাল ভার্স স্ট্রাকচারকে ভাঙ্গতে চাননি। একটা বাঁধা ছকের উপর
দাঁড়িয়েই হয়তো চেয়েছিলেন কন্টেন্টের সাবলীল কম্যুনিকেশন। আর এই কারণেই হয়তো
ওনার কবিতায় সংস্কৃত কাব্যের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। পুরাণ কথার ব্যবহারের পেছনে
সম্ভবতঃ একই চিন্তা কাজ করছে। কনভেনশনাল বুর্জোয়া সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে আঘাত
করার জন্যে সূক্ষ্মভাবে পুরাণের পুনঃনির্মাণও করেছেন তিনি। এই ক্ষেত্রে অবশ্য
পাঠ্য তাঁর ‘শকুন্তলা’ কবিতা।
কাব্যভাষার দিক থেকে কোন নতুন সংযোজন না করলেও পুরাণকে অন্যভাবে দেখার ক্ষেত্রে
বাঙলা তথা ভারতীয় সাহিত্যে ‘শকুন্তলা’-র জুড়ি মেলা ভার। এক বিখ্যাত তেলুগু কবির কাছে শুনেছিলাম, তিনি ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ‘শকুন্তলা’ পড়ে বিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন—ঠিক করেছিলেন, যে করে হোক সরোজ দত্তর সব কবিতা অনুবাদ করবেন। হ্যাঁ, আজ তাঁর প্রায় সব কবিতাই অনুদিত হয়েছে তেলুগু ভাষায়। আঙ্গিকের দিক থেকে
না হলেও, বিষয়বস্তুর স্বকীয়তায় সরোজ দত্ত চার্বাকগুরু
বৃহস্পতি-তুল্য। রবীন্দ্রনাথের মত উপনিষদীয় ‘মাখন’ মাখিয়ে তিনি গর্ভিণী শকুন্তলা-কে দেখেননি,
দেখেছেন একজন অরক্ষিতা অরণ্যকুমারীর উপর প্রিভিলেজড ক্লাসের
সেক্সপ্লয়টেশনের নিদর্শন হিসাবে—
‘দুর্বাসার অভিশাপ,
অভিজ্ঞান অঙ্গুরী কাহিনী
স্বর্গমিলনের দৃশ্য, মিথ্যাকথা হীন
প্রবচনা—
রাজার লালসা-যূপে
অসংখ্যের এক নারীমেধ
দৈবের চক্রান্ত বলি
রাজকবি করেছে রটনা।
গৃহস্বামী দেশান্তরে, অরক্ষিতা
দরিদ্রের ঘরে
নারীমাংস লোভে রাজা
মৃগমাংস এল পরিহরি—
অরুচি হয়েছে যার
অবিশ্রাম নাগরীবিহারে
তাহার কথার ফাঁদে ধরা দিল
অরণ্যকিশোরী।
স্তব্ধ আজি নাট্যশালা, নান্দীমুখ আতংকে
নির্বাক
বিদীর্ণ কাব্যের মেঘ, সত্যসূর্য উঠেছে
অম্বরে—
দর্শক শিহরি করে নাটিকার
মর্মকথা পাঠ,
‘বালিকা গর্ভিণী হল
লম্পটের কপট আদরে’—
রাজার প্রসাদভোজী রাজকবি
রচে নাট্যকলা,
অন্ধকার রঙ্গভূমি, ভুলুন্ঠিতা কাঁদে
শকুন্তলা।’
কবিতা অনুবাদ করার
ক্ষেত্রেও সরোজ দত্ত কোনো এক্সপেরিমেন্টেশনের মধ্যে যাননি। সহজ-সরল ভাবে করেছেন
গোটা কাজটা। প্রয়োজনের ভাষাকে গ্রহণ করেছেন অনুবাদের শরীর-নির্মাণের জন্যে। ভাষার
অ্যরাবেস্ক তৈরি না করেও যে কবিতাকে মনগ্রাহী করে তোলা যায়, তার প্রমাণ ছড়িয়ে
আছে তাঁর করা অনুবাদগুলোর মধ্যে। সরোজ দত্ত বিষয়ের দিকে নজর দিয়েছেন অনেক বেশি—তাঁর কন্টেন্ট নিয়েই কারবার। অন্যদের মত আঙ্গিক নিয়ে অতটা ভাবেননি। নিজের
সৃষ্টির রসে মজে যাবার চেয়ে পলিটিকাল কমিটমেন্টকে দেখেছেন অনেক বড় করে। অনুবাদ
করার জন্যেও তাই বেছে নিয়েছিলেন মায়াকভস্কি, পরভেজ শাহিদি,
ইকবাল, ভাসপারভ, চেন ঈ
প্রমুখদের। তাঁর প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল কম্যুনিকেট করা এবং তিনি তা করেছেন
সাফল্যের সাথে। এরমধ্যে যেটা শিক্ষণীয়, তা হল, উনি কোনভাবেই কবিতার নান্দনিক মূল্যকে ছোট করেননি; আবার
নান্দনিক নির্মাণের স্বার্থে বিষয়বস্তুকেও জলাঞ্জলি দেননি। সমতা বজায় রেখেছেন
কন্টেন্টকে প্রাধান্য দিয়ে। কখনো কখনো কবিতার টাইম অ্যান্ড স্পেস ভেঙ্গেছেন,
কিন্তু তা বিষয়বস্তুর সাথে সঙ্গতি রেখেই—আরো
ভালভাবে বললে, বিষয়বস্তুকে আরো গভীরভাবে অনুভব করার জন্যে।
গদ্য অনুবাদের ক্ষেত্রেও এই একই দৃষ্টিভঙ্গীর প্রকাশ দেখতে পাওয়া যায়।
চোদ্দ-পনেরো বছর বয়স থেকে
বাড়ির হাতে-লেখা পত্রিকা
‘মঞ্জরী’তে কবিতা লেখা শুরু করেন সরোজ দত্ত।
ওই পত্রিকার সম্পাদকও ছিলেন তিনিই। মৌলিক কবিতা লেখায় অনেকটা সময় অতিবাহিত করার পর
তিনি শুরু করেন কবিতা অনুবাদ করা। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি পর্যায়ে তিনি প্রায়
চব্বিশটি কবিতা অনুবাদ করেন। সেই সময়ে সরোজ দত্ত ছিলেন বাংলার কম্যুনিস্ট পার্টির
মুখপত্র ‘দৈনিক স্বাধীনতা’র
সম্পাদকমন্ডলীর সদস্য এবং নিউজ এডিটর। ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকাতেই মূলতঃ এইসব অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। আজও কম্যুনিস্ট ভেটেরানদের
মুখে মুখে ঘোরে সরোজ দত্তর করা ভাসপারভ বা পাবলো নেরুদা বা প্যাট্রিক লুমাম্বা বা মাও-সে-তুঙের
কবিতার অনুবাদ। সারাজীবন ধরে সরোজ দত্ত সেইসব কবিতাই লিখেছেন, বা অনুবাদ করেছেন, যা সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্খার
দলিল। তাঁর সাহিত্যিক জীবন এবং রাজনৈতিক স্বত্তা একটাই বিন্দুতে এসে মিলেছে—
বিপ্লব!
অনুবাদ কবিতায় সরোজ দত্ত
খুব একটা ছন্দের ব্যবহার করেননি। তাঁর যে গুটিকয়েক লেখা ছন্দবদ্ধ, তার মধ্যে
মায়াকভস্কির ‘Our March(1917)’ কবিতা সর্বাধিক
গুরুত্ত্বপূর্ণ। গোটা কবিতাটাই অনুদিত হয়েছে ছয়মাত্রার কলাবৃত্ত ছন্দে। রাজীব
চৌধুরি এই কবিতার নির্মাণ সম্পর্কে বলেছেন— ‘…ছয়মাত্রার দুটো করে পূর্ণপর্ব এবং দুইমাত্রার একটা করে অতিপর্ব নিয়ে এই
(কবিতার) গঠন। এরমধ্যে কিছু কিছু পংক্তি আবার দলবৃত্ত রীতি অনুযায়ী মাত্রাবিভাজনেও
অসংগতিপূর্ণ নয়। সুতরাং মাত্রাবৃত্ত বা কলাবৃত্তে অনুদিত কবিতার রন্ধ্রে রন্ধ্রে
রয়েছে দলবৃত্তের পদসঞ্চার।’ এই কবিতার ভাষান্তরের সময় কবি
নজর দিয়েছেন অর্থের ব্যঞ্জনায়। দুটো কবিতা পাশাপাশি রেখে পড়লে ব্যাপারটা অনেকখানি
পরিষ্কার হবে। মায়াকভস্কির কবিতার ইংরাজি অনুবাদের সঙ্গে আমরা প্রায় সকলেই পরিচিত,
তাই নীচে শুধু সরোজ দত্ত’র করা বঙ্গানুবাদটাই
(অক্টোবর ১৯১৭) দিলাম –
কাঁপে রাজপথ বিদ্রোহী
পদভারে
চরণে দলিত দম্ভের চূড়া
যত-
আমরা চলেছি উদ্দাম জলধারা
মহাপ্রলয়ের মহাঝঞ্ঝার মত।
অশ্বের মত ছুটে চলে
দিনগুলি
বছরবিলীন বিষাদ-আঁধার
মাঝে-
গতির দেবতা চাবুকে চালায়
রথ,
আমাদের বুক দামামার মত
বাজে।
কার পতাকায় আছে এত গাঢ়
লাল?
কে পারে বিঁধিতে বুলেটে
মোদের প্রাণ?
নেই আমাদের রাইফেল নেই সোনা;
কিবা এসে যায়? কন্ঠে রয়েছে গান।
সবুজ আগুনে প্রান্তর
জ্বলে ওঠে,
ফেটে পড়ে দিন আলোর আঘাত
লেগে-
রামধনু, তুমি বাঁকাও
তোমার ধনু
তুরঙ্গদল উধাও ঝড়ের বেগে।
লক্ষ তারায় বিক্ষত নভপট,
কিবা আসে যায়? কে থামায় এই গান?
জানি একদিন এ আকাশ নেব
জিনে
নরজীবনেই স্বর্গে জিনিব স্থান।
গাও গান গাও পান করো
প্রাণভরে।
রক্তে নাচুক বহ্নি চমৎকার-
তুমুল ছন্দে স্পন্দিত হোক
বুক
কঠিন বর্মে উঠুক ঝনাৎকার।
অনুবাদ সাহিত্যে
মুন্সীয়ানা কার কতটা,
সেটা খুব ভালভাবে না হলেও অল্পবিস্তর ঠিক করা যায় একই কবিতার দুই বা
তিন’টি অনুবাদের তুলনামূলক আলোচনার মধ্যে দিয়ে। এইক্ষেত্রে
একটা কমপ্যারেটিভ স্টাডি, স্বল্পাকারে হলেও, করা যেতে পারে সরোজ দত্ত এবং বিষ্ণু দে’র মধ্যে।
এঁরা দু’জনেই মোটামুটিভাবে কন্টেম্পোরারি এবং কবি-অনুবাদক
হিসাবে সাহিত্যমহলে শ্রদ্ধেয়।
ধরা যাক মাও-এর ‘The Swimming’
কবিতাটি। ইংরাজি অনুবাদের শুরু থেকে শেষ অবধি লক্ষ করলে দেখা যাবে যে বিষ্ণু দে
তাঁর অনুবাদের এস্থেটিক ভ্যাল্যু নিয়ে এতটাই চিন্তিত হয়ে পড়েছেন যে, ক্রমশঃ জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠেছেন। অপরপ্রান্তে সরোজ দত্ত কবিতার
কাব্যগুণকে বজায় রেখেছেন, কিন্তু কোনভাবেই মূল বক্তব্যকে
দুর্বধ্য করে তোলেননি। একটা ছোট উদাহরণ দিলেই ব্যাপারটা স্পষ্ট হবে। কবিতার
একেবারে শেষে আছে –
The mountain goddess if she is
still there
Will marvel at a world so
changed.
বিষ্ণু দে’র অনুবাদ অনুযায়ী –
দেবী তো সুখেই থাকেন
ওইখানে,
তবে কিনা এই দুনিয়া বদলে
অবাক মূর্তিবৎ।
সরোজ দত্ত’র উপস্থাপনা অনেক
সোজাসাপটা –
আর যদি এখনো সেখানে থেকে
থাকেন
পাহাড়ের দেবী
তাহলে চমকে উঠবেন তিনি
এ কি! এত পাল্টে গেছে
তাঁর দুনিয়া!
আঙ্গিকগত দিক থেকে বিষ্ণু
দে’র
লেখা অনেক বেশি সমৃদ্ধ। গোটা কবিতাটা তাই উনি ছয়মাত্রার কলাবৃত্ত ছন্দে অনুবাদ
করেছেন। শব্দের ব্যবহার চূড়ান্তভাবে নান্দনিক। একথাও বললে অত্যুক্তি হয় না,
যে ফর্মের দিক থেকে বিষ্ণু দে সরোজ দত্ত’র
থেকে সহস্র যোজন এগিয়ে। কিন্তু তাঁর বঙ্গানুবাদের সাথে যদি ইংরাজি অনুবাদ মেলানো
হয়, তাহলে দেখা যাবে তা নিতান্তই একটি অক্ষম ট্রান্সলেশন।
কবিতার মূল বিষয়বস্তুকে বিষ্ণু দে অনুবাদে প্রকাশ করতে ব্যার্থ হয়েছেন। গোটা কবিতা
পড়লে এও দেখা যাবে যে তিনি মূল কবিতার ক্রিয়াপদেরও পরিবর্তন ঘটিয়েছেন। অনুবাদকের
এই স্বাধীনতা থাক্তেই পারে, কিন্তু প্রশ্ন হল, কন্টেন্ট আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছে না তো? খেদের সাথে বলতে
হয়, হচ্ছে! বিষ্ণু দে’র অনুবাদ গ্রীক
নাটকের মত ধ্রুপদী, কিন্তু তাতে মূল কবিতার নাট্যগুণ এবং
বিষয়গুণ উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মূল কবিতার আঙ্গিক থেকে সরে গিয়েও, তারমধ্যে নিজস্ব বৈশিষ্ঠ্য বজায় রেখেও তাই সরোজ দত্ত উজ্জ্বল হয়ে উঠেছেন।
তিনি মাও-এর মত প্রাচীন চিনা কবিতার স্বরভঙ্গী (শুই তিয়াও তাও)-কে অনুসরণ করেননি,
কিন্তু কোনভাবে তা ক্ষুণ্নও করেননি। বাঙালি পাঠকের কাছে মাও-এর
কবিতার নির্ভুল কম্যুনিকেশন একমাত্র ঘটেছে তাঁর হাত দিয়েই। সেই অনুবাদের শব্দ
নিতান্তই সাধারণ, কিন্তু কন্সট্রাকশন হিসাবে দেখলে তা অসামান্য
ডাইনামিক।
জটিল ফর্মালিস্ট
ট্রীটমেন্ট কিভাবে কন্টেন্টকে গ্রাস করে এবং তার সাথে কবিতাকে সাধারণের মাঝখান
থেকে দূরে ঠেলে দেয়,
তার আরো উদাহরণ দেওয়া যায় এই একই কবিতা থেকে। ইংরাজি অনুবাদে আছে
–
It was by a stream that the
master said-
Thus do things flow away!
বিষ্ণু দে অনুবাদ করেছেন –
কে যেন নদীর পারানি কহিল
কিবা,
পারানি জনের অমনি ওরে
ধরণ।
সরোজ দত্ত লিখেছেন –
এই নদী দেখেই তো একদিন
ঋষি বলেছিল,
এ যেন সারা প্রকৃতি বয়ে
চলেছে!
উপরুক্ত কনফ্যুসিয়ান
মিথের অনুবাদ করতে গিয়ে বিষ্ণু দে অকারণ জটিলতার সৃষ্টি করেছেন। বিকৃ্ত করেছেন
কবিতার সারবস্তুকে। অন্যদিকে সরোজ দত্ত’র অনুবাদ অনেক সহজবোধ্য, সাবলীল, স্পষ্ট এবং একই সাথে শৈল্পিক। আরো একটা
ব্যাপার লক্ষ করার মত— ইংরাজি অনু্বাদে আছে, ‘It was by a stream that the master said…’। সরোজ দত্ত অনুবাদ করেছেন, ‘এই নদী দেখেই তো একদিন ঋষি বলেছিল…’। লক্ষ করলে দেখা যাবে, উনি ঋষির সাথে ‘বলেছিল’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন, ‘বলেছিলেন’ নয়। কারণটা আদৌ
সাধারণ নয়। এই শব্দ ব্যবহারের মূলে রয়েছে তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শ। চীনা কম্যুনিস্টরা
বরাবর কনফ্যুসিয়সকে একজন দুর্বৃত্ত হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। সংশোধনবাদীদের অভিযুক্ত
করেছেন আধুনিক কনফ্যুসিয়স বলে। এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে, একটি
ভ্রাতৃপ্রতিম কম্যুনিস্ট পার্টির কর্মী সরোজ দত্ত কোনভাবেই সেই এলিটিস্ট ভাববাদী
দার্শনিককে ‘আপনি-আজ্ঞে’ সম্বোধন করতে
পারেননি। ‘বলেছিলেন’ শব্দটি ব্যবহার
করলে হয়তো কবিতার পংক্তিটা পড়তে বা শুনতে অনেক ভাল লাগত,
কিন্তু কম্প্রোমাইজ করেননি সরোজ দত্ত। আসলে, একজন কম্যুনিস্ট
কখনো পলিটিক্সকে বাদ দিয়ে শিল্প নিয়ে ব্যাস্ত থাকেন না। তিনিই বা এর বিপরীতে যান
কি করে!
সরোজ দত্ত’র মতবাদিক আবেগের
স্পর্শ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে তাঁর অনুবাদগুলোর মধ্যে। কবিতার মূল বজায় রেখে কিভাবে
অনুবাদকে একইসাথে বৈপ্লবিক এবং নান্দনিক মাত্রা দেওয়া যায়, তা
বার্টল্ট ব্রেখটের ‘Questions from a Worker Who Reads’
কবিতার অনুবাদটা পড়লেই বোঝা যাবে। মূল কবিতার (ইংরাজি অনুবাদ) একেবারে শুরুতে
ব্রেখট লিখেছেন—
Who built Thebes of the seven
gates?
সরোজ দত্ত’র অনুবাদটা হয়েছে
একটু অন্যরকম –
কারা গড়েছিল থেবেস নগরীর
সাত-সাতটি প্রবেশদ্বার?
কবিতার মূল অর্থের দিক
থেকে জোরটা দেওয়া উচিত নগর নির্মাণের উপরে, কখনই প্রবেশদ্বারের উপর নয়। প্রশ্ন জাগে,
সরোজ দত্ত’র মত একজন চৌখশ ট্রান্সলেটর কি করে
এমন একটা ভুল করলেন? এটা কি তাড়াহুড়োতে ঘটে যাওয়া কোন প্রমাদ
না ইচ্ছাকৃত ‘ভুল’? নগরীর প্রবেশদ্বার
বা সিংহদরজা একটা বিশেষ শ্রেণী বা ক্লাসকে রিপ্রেজেন্ট করে। সেই শ্রেণীভুক্তরা উৎপাদনের
উপকরণের মালিকানা নিজেদের আওতায় রাখে, ফলতঃ উৎপাদক শ্রেণী
তার উৎপন্ন বস্তুর উপর কোনো কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। উৎপাদকের রক্তে-ঘামে
অপ্রেসররা ফুলে ফেঁপে ওঠে। বৃহৎ মানুষদের নির্মাণের পেছনের কারিগররা হলেন সেই
নামহীন অসংখ্য মানুষ, যারা সমাজে সর্বাধিক দিয়েও সামাজিকভাবে
পরিত্যক্ত। প্রবেশদ্বারের উপর জোর আরোপ করে সরোজ দত্ত সম্ভবত শ্রেণীবিভক্ত সমাজে
যুগ যুগ ধরে চলে আসা প্রোডিউসার-কনজিউমার সম্পর্কের anti-egalitarian রূপটাই ধরতে চেয়েছেন।
কবিতার এক জায়গায় ‘imperial Rome’
শব্দের অনুবাদ করতে গিয়ে যখন শঙ্খ ঘোষ বা বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মত প্রথিতযশা
কবিরা ‘মোহনীয় রোম’ বা ‘সার্বভৌম রোম’ ব্যবহার করেছেন, তখন সরোজ দত্ত লিখেছেন ‘সাম্রাজ্যিক রোম’। একটা শব্দের মধ্যে দিয়ে
রোমান সাম্রাজ্যের সামগ্রিক রাষ্ট্রচরিত্র ব্যাখ্যা করে দেওয়ার ব্যাপারটা
ব্যক্তিমতাদর্শের নির্দিষ্ট প্রকাশ। এই একই কবিতার শেষ স্তবকের আগের স্তবকে আছে—
Every page a victory.
Who cooked the fest for the
victors?
Every ten years a great man.
Who paid the bill;
এই অংশের অনুবাদে সরোজ
দত্ত’র
বলিষ্ঠতা কলমের সাথে সাথে বৈপ্লবিক আবেগের মাত্রা সপ্তম অক্টেভ স্পর্শ করেছে—
ইতিহাসের পাতায়
বিজয়কাহিনী,
কিন্তু বিজয়োৎসবের খরচ
জুগিয়েছে কারা?
প্রতি দশ বছর অন্তর একজন
মহাপুরুষের আবির্ভাব,
কিন্তু কাদের গাঁটের শেষ
কানাকড়ি টেনে নিয়ে
তৈরি হয়েছিল, সেই মহা
আবির্ভাবের পথ?
সরোজ দত্ত’র মৌলিক কবিতার মত,
তাঁর অনুবাদও রেভল্যুশনারি স্পিরিটে ভরপুর। বেছে বেছে সেইসব কবিতাই
ট্রান্সলেট করেছেন যার সামাজিক-রাজনৈতিক মূল্য আছে – আছে
নতুন মানুষের মূল্যবোধ গঠন করার চাবিকাঠি। টেকনিকাল দিক থেকে বিচার করলে দেখা যাবে,
কিছু বিচ্যুতি সত্তেও (যা পৃথিবীর সব অনু্বাদকর্মেই বর্তমান),
সরোজ দত্ত একজন কবিতা অনুবাদক হিসাবে বাংলা সাহিত্যে একটা বিশেষ
আসনের দাবিদার। তিনি হয়তো বিশাল কিছু আলাদা নন অন্যান্য সেরা অনুবাদককদের থেকে,
তিনি হয়তো স্রোতেরই একটা অংশমাত্র – কিন্তু
তবু সেই বিরল প্রজাতির কবি-অনুবাদক, যাঁর কলমে আন্তর্জাতিক
সাহিত্য হয়ে উঠেছে বাংলার ঘরের সম্পদ।
কবিতা অনুবাদের ক্ষেত্রে
আরো খানিকটা গভীরে ঢুকলে মন্দ হত না, কিন্তু বেশি লেখার অবকাশ নেই, কারণ শীঘ্রই আমাদের প্রবেশ করতে হবে গদ্য অনুবাদের জগতে এবং সেখান থেকে
একলাফে পৌঁছে যেতে হবে তাঁর প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক কার্যকলাপের প্রাঙ্গণে। আজকে সরোজ
দত্ত কে যত না কবি হিসাবে মনে রাখা হয়েছে, তারচেয়ে ঢের বেশি
মানুষ তাঁকে মনে রেখেছেন একজন বিপ্লবী হিসাবে, সিপিআই(এম-এল)-এর পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য কমিটির সম্পাদক হিসাবে, একজন শহীদ
হিসাবে।
(অসমাপ্ত)

No comments:
Post a Comment