বছর দেড়েক আগের কথা। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামকে কেন্দ্র করে বিরোধিতার
মহাপ্লাবন খর-কুটোর মতো ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সিপিএম-এর ব্যারিকেড। ছাত্র
ফেডারেশনের ঘাঁটিগুলো-ও নড়বড় করছে। এখানে হারছে, ওখানে ঝাড় খাচ্ছে। সব দিক থেকেই
বাংলা ছাড়া অবস্থা। এরকম-ই একদিন দুপুরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় চত্তরে ঢুকতে গিয়ে চোখে পড়ল বিশাল
পোস্টার—‘FAS, FAS, সাঁই,
সাঁই’—এস.এফ.আই.-কে দুরমুশ করে ছাত্র ইউনিয়নে ‘ফোরাম ফর
আর্টস স্টুডেন্টস’-এর দ্বিতীয় বারের জন্যে ক্ষমতায় আসার
উল্লাস (এখন অবশ্য আবার ছাত্র ফেডারেশন—পুনর্দখলের যুগ চলছে)। একটু পরিবর্তিত
এই 'নবারুনণন'
কোন সংকেত পাঠাচ্ছে ভাবতে ভাবতে হাঁটছিলাম দুজনে—কবি (নামটা এখানে
বলছিনা) এবং আমি। পপুলিস্টদের সাথে দক্ষিণ দিকের বাসিন্দাদের যৌথমোর্চার ছবিটা বেশ স্পষ্ট। মাও-সমর্থক
এক ছাত্র-নেতা জানাল, ‘সিপিআই(এম)-কে আটকাতে ট্যাকটিকাল অ্যালায়েন্স’। শুনে ধাক্কা লাগল। নব্যরা হয়ত
জানেই না যে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়েরই ‘সূর্যসেনা’ খ্যাত
তিমির বরণ সিংহ কৃষকের মুক্তি আনতে গিয়ে এই ‘দক্ষিণী’-দের হাতেই খুন হয়েছিলেন। সত্যি, সময়ের পলি সব
ক্ষত-চিহ্নই ঢেকে দেয়, কালচে করে দেয় তাজা রক্তের দাগকে! এই
ছাত্রগুলোকে যদি মাও একবার দেখতেন! ‘আটটা-নটার সূর্য’-র এমন গ্রহণ লাগা দশা কখনও কি
কল্পনা করেছিলেন তিনি? রণনীতিকে বাদ দিয়ে যে রণকৌশল হয় না সেইটাই ভুলে গেছে ওরা—ওদের ভুলিয়ে
দেওয়া হয়েছে। নতুন প্রজন্ম মেমোসাইডের গর্ভজাত।
যাইহোক, কবিকে নিয়ে ঢুকলাম
কবিতা পড়ার ঘরে। Rostrum-এ উঠে তিনি পকেট থেকে বার করলেন সদ্য প্রকাশিত ‘RS...’ পরের ব্যাপারটা একেবারেই
খৃষ্টপূর্ব ৪৭-এর সিজারের মতো: ‘veni, vidi, vici’। যারা দুদিন আগে মার্কস, এঙ্গেলস-এর ছবি
ছিঁড়ে ‘খাও খাও’ খ্যাত সুমন-মিঞার
কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে চিৎকার করছিল ‘জানান দিচ্ছে নন্দীগ্রাম...’, তারাই দেখলাম
উল্লাসে ফেটে পড়ল কমিউনিস্ট কবির কবিতা শুনে। কবি হাসছেন মিটিমিটি, ছড়িয়ে দিচ্ছেন
শ্লেষ-আইরনি, তবে খুবই subtle...। অনুষ্ঠান শেষ
করে দুজনে উঠে পড়লাম একটা ট্যাক্সিতে। এক্সাইড মোড়ে এসে হঠাৎ তিনি বলে উঠলেন, ‘হ্যাঁ রে, মাছ তো জল ছাড়া বাঁচে না, কিন্তু মাছের যদি মনে হয়
জল তার কাছে আসবে তাহলে কন্সিকোয়েন্সটা ঠিক কি রকম হবে বল দিকি?’ হেসে ফেললাম। কবি পার্টিজান হতে পারেন, কিন্তু আফটার অল
কবি। মায়কোভস্কি সিন্ড্রোমে ভোগেন। সহজে ক্ষোভ চাপতে পারেন না, rhetoric মারফৎ প্রকাশ
করে ফেলেন। গাড়ি ছুটছে ঢিমে তালে, কবি বলে চলেছেন অনর্গল: ‘আত্ম-সন্তুষ্টি শেষ করে
দিল... আত্মসন্তুষ্টি, আত্মসন্তুষ্টি, আত্মসন্তুষ্টি...’। মনে পড়ে গেল চারু মজুমদারের
উচ্চারণ করা সতর্কবাণী: ‘আত্ম-সন্তুষ্টির অপর নাম সংশোধনবাদ’। আত্মসন্তুষ্টি
জনগণকে উপেক্ষা করতে শেখায়, শেখায় নিজেকে ইতিহাসের নিয়ন্তা ভাবতে। মার্কসবাদ-লেনিনবাদের
বুনিয়াদগুলোকে অস্বীকার করাই হল আত্মসন্তুষ্টির অন্যতম প্রধান দিক। জনগণের সাথে গড়ে
ওঠা বিচ্ছিন্নতা কাটাতে মাছটাকেই ফিরতে হয় জলের কাছে। উল্টোটা এক্ষেত্রে খাটে না। জারুজেলস্কীর ‘মার্শাল ল’ বা চিদাম্বরম সাহেবের ‘ইউ.এ.পি.এ.’, কোনটাই কাজ দেয় না। বিচ্ছিন্নতা
বাড়ে, বেড়ে চলে। এই ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতার সুযোগ নিয়ে পথে নামে
সি.আই.এ.-র মদতপুষ্ট ওয়ালেসারা। তাদের পঞ্চম-বাহিনীর কাজটা করে সুশীল আন্দ্রে ভাইদার দল। অবক্ষয়ী ‘বাম’-এর জ্বালায় জর্জরিত জনগণ বেছে নেন সুবিধাবাদী সুশীলদের সার্টিফিকেট
পাওয়া মানুষখেকো খুনে হায়নাগুলোকে, যারা তখনকার মতো ক্যানাইন টিথগুলো লুকিয়ে রাখে—অপেক্ষা করে ঠিক
সময়ের।
সিপিএম-এর ওপরতলায় বসে
থাকা গর্বাচেভদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার গড়ে উঠেছে জেলা থেকে লোকাল, সমস্ত কমিটিগুলোতে। তৈরি হয়েছে
অসংখ্য ইয়েলেৎসিন। ওপরের আর মাঝের পচা আলুর দৌলতে নিচের গোটা ফসলটাই পচে
যাচ্ছে। (অনেকে বলেন ওপরটা ঠিক আছে; আসল প্রবলেমটা মাঝে। তারা বোঝেন
না যে, মাছ এবং কম্যুনিস্ট পার্টির পচন শুরু হয় মাথা থেকে। সমস্যাটা
অরগানাইজেশনাল নয়, পলিটিকাল এবং অবশ্যই থেওরিটিকাল।) চল্লিশলাখি
জোনাল সম্পাদককে লাথি মেরে বার করার বদলে পার্টি নেতৃত্ব ডিফেন্ড করেন! করতেই হয়, কারণ অনুজের
অগ্রজদের ঝুলিটা খুলে গেলে বিষম বিপদ! তবে বড়দা-রা একটা ব্যাপার বোঝেন না:
দেড়-হাতি গামছা দিয়ে মাথাটা ঢাকতে গেলে পাছা বেড়িয়ে যায়। কেন্দু পাতার
চোরাচালানকারীদের থেকে তোলা তুলে সংগঠন করনেওলাদের চেয়ে কোন অংশে কম খারাপ অনুজ পাণ্ডে?
কমরেডস, বাংলার জনগণের
শরীর থেকে ইমারজেন্সির ঘাগুলো শুকিয়ে গেছে। রামা কৈবর্ত-হাসিম শেখদের
সামনে রেখে গড়ে ওঠা ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েত আজ নয়া-জোতদারদের এস্টাবলিসমেন্ট। তৈরি হয়েছে
আমলাতান্ত্রিক সামন্তবাদ। ৭৮-এর পর জামা পালটে, সালকিয়া প্লেনামের ‘গণ পার্টি’-র ‘কল্যাণে’, প্রতিক্রিয়াপন্থীরা হয়ে উঠেছেন বাম ব্রিগেডের
নেতা-কর্মী। এই ধান্দাবাজদের দেওয়া চোটগুলো আজ দগদগ করছে বাংলার সাধারণ খেটে-খাওয়া মানুষের গায়ে। ‘আমরা অনেক উন্নয়ন করেছি।’ হাস্যকর
যুক্তি। ছিটে-ফোটা খৈ ছড়িয়ে ‘রিলিফ’ দিলে
সাময়িক বিশ্বাস অর্জন করা যায়, কিন্তু তা বেশিদিন টিকিয়ে
রাখা যায়না। কম্যুনিস্ট পার্টি বিপ্লব করে, কারণ সে জানে যে রাষ্ট্র-কাঠামো দখল করে
সামগ্রিক পরিবর্তন না ঘটালে কোনও বিকল্পের সন্ধান দেওয়া যায় না। সাধারণ
খেটে-খাওয়া মানুষের দৈনন্দিন সংগ্রামের সাথে যুক্ত হতে হয় বিপ্লব করার জন্য, ভোট কুড়িয়ে আসন
জেতার স্বার্থে নয়। নকশালদের ‘টাইট’ দিতে যে বইটা আপনারা
সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেন, তাতে কি লেখা আছে দেখবেন?
লেনিন লিখছেন: ‘Communists must learn to create a new, uncustomary,
non-opportunist, and non-careerist parliamentarianism; the Communist parties
must issue their slogans; true proletarians, with the help of the unorganised and
downtrodden poor, should distribute leaflets, canvass workers' houses and cottages of the rural
proletarians and peasants in the remote villages...; they should go into the public houses,
penetrate into unions, societies and chance gatherings of the common people, and speak to the people,
not in learned (or very parliamentary) language, they should not at all strive to ‘get seats’ in
parliament, but should everywhere try to get people to think, and draw the
masses into the
struggle, to take the bourgeoisie at its word and utilise the machinery it has
set up, the elections it has appointed, and the appeals it has made to the
people; they should try to explain to the people what Bolshevism is, in a way that was
never possible (under bourgeois rule) outside of election times...’ [Leftwing Communism: An Infantile
Disorder] অর্থাৎ লেনিনের নির্দেশ, কম্যুনিস্ট পার্টি আসন লাভের জন্য
নির্বাচনে লড়বেন না, তাঁরা জনগণের মধ্যে বিপ্লবী রাজনীতির
প্রচার চালিয়ে তাদের সংগ্রামের ময়দানে টেনে আনবেন, ইলেকশন-কে
ব্যবহার করবেন প্রচারের মঞ্চ হিসাবে। আপনারা কি কখন তা করেছেন? উলটে,
আপনারা সংসদীয় ব্যবস্থা সম্পর্কে মানুষের মোহকে দ্বিগুণ করার
রাস্তায় হেঁটেছেন। বেঁছে নিয়েছেন ‘রিলিফ’-এর পথ। এই কাঠামোটাই তো শোষণের। তার আওতায় থেকে কতটুকু করতে
পারেন আপনারা? হ্যাঁ, যত দিন পেরেছেন
স্বজনপোষণ করেছেন। রাক্ষুসে খিদেটা বারিয়ে দিয়ে বহু ক্যাডারকে করে
তুলেছেন ১০০% সুবিধাভোগী, অসত। ১৯৬৭ সালের নকশালবাড়ির অভ্যুত্থানের পর যদি আপনারা
সংসদ বহির্ভূত আন্দোলনের পথ অনুসরণ করতেন তাহলে আজ হয়ত বাম আন্দোলনের এই দুর্দশা
হোতো না, ভারতের ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হোতো।
সংসদ সর্বস্বতা আপনাদের এমন
ভাবে গ্রাস করেছে যে, আপনারা কুযুক্তি হাজির করতেও পিছপা হচ্ছেন না। মার্ক্স-এর ‘ফ্রান্স-এ
শ্রেণি সংগ্রাম’ বইয়ের যে ভূমিকা ১৮৯৫ সালে এঙ্গেলস
লিখেছিলেন তার থেকে কিছু অংশবিশেষ হাজির করে সংসদীয় পাঁকে গা ডুবিয়ে রাখাকে
জাস্টিফাই করেছেন। ভূমিকায় এঙ্গেলস লিখেছিলেন কীভাবে পারি কম্যুনের রক্তাক্ত পরিসমাপ্তিতে
শ্রমিক আন্দোলনের ভরকেন্দ্র জার্মানিতে সরে আসে, এবং জার্মান
শ্রমিকরা সংসদকে কেমন বুদ্ধিমত্তার সাথে ব্যাবহার করেন। এঙ্গেলস এও
বলেন, ‘They (অর্থাৎ জার্মান শ্রমিকরা) supplied their comrades in all
countries with a new weapon, and one of the most potent, when they showed them
how to make use of universal suffrage.’ [Fredrikh Engels’ Introduction to
Marx’s ‘Class Struggle in France’] তিনি আরও জানান, ‘The irony of world history turns everything upside down.
We, the ‘revolutionaries’, the ‘overthrowers’ — we are thriving far better on legal methods than on
illegal methods and overthrow.’ [Fredrikh Engels’ Introduction to Marx’s ‘Class
Struggle in France’] কিন্তু এর মানে কি সংসদ-সর্বস্ব রাজনীতিকে ছাড়পত্র?! ১৯ শতকের
শেষের জার্মানির বিশেষ পরিস্থিতিতে শ্রমিক শ্রেণির সংসদীয় সংগ্রামের রণকৌশল এবং
আজকের দিনে ভারতের মত একটা আধা-সামন্তি আধা-ঔপনিবেশিক (চরিত্র নয়া-ঔপনিবেশিক)
দেশের বুকে আপনাদের পার্লিয়ামেন্ট-কেন্দ্রিক কার্যকলাপ এক?! ও কমরেড, শুনলে ক্লাস এইটের বাচ্চাও হাসবে যে। জার্মান সমাজ
গণতন্ত্রী দলের মুখপত্র ‘Vorwärts’-এর পাতায় এই ভূমিকা থেকে খাবলা খাবলা উদ্ধৃতি তুলে একবার আপনাদের মতোই জালিয়াতি
করেছিল য়্যুলিয়াম লিবনেখট। এর ফলে এঙ্গেলস যারপরনাই চটেছিলেন। মৃত্যুর ক’এক মাস আগে,
১৮৯৫-এর ১’লা এপ্রিল, তিনি কার্ল কাউটস্কি-কে একটা চিঠি দেন। তিনি লেখেন: ‘To my astonishment I see in Vorwärts today an extract from my Introduction, printed
without my prior knowledge and trimmed in such a fashion that I appear as a
peaceful worshipper of legality at any price… I shall give Liebknecht a good
piece of my mind on that score and also, no matter who they are, to those who
gave him the opportunity to misrepresent my opinion without even telling me a
word about it ...’ [Marx-Engels,
Selected Correspondence] এই চিঠির ঠিক দু’দিন পরে,
অর্থাৎ ৩’রা এপ্রিল, এঙ্গেলস পল লাফার্জ-কে একটা চিঠিতে লেখেন, ‘... Liebknecht just played me a nice
trick. He has taken from my Introduction to Marx’s articles on France of
1848-50 everything that could serve him to support the tactic of peace at
any price and of opposition to force and violence, which it has pleased him
for some time now to preach, especially at present when coercive laws are being
prepared in Berlin. But I am preaching these tactics only for the Germany of
today, and even with an important proviso. In France, Belgium,
Italy, and Austria these tactics could not be followed in their entirety and in
Germany may become inapplicable tomorrow ...’ [Marx-Engels, Selected Correspondence] আর কিছু
বলার প্রয়োজন আছে? মনে তো হয় না।
কমরেডস, আজ আপনারা
অকেজো অলংকারে পরিণত হয়েছেন। আমলারা আপনাদের ব্যাবহার করেছে, মানুষের মনে
ঘৃণা জাগিয়ে তুলেছে লাল পতাকা সম্পর্কে। ৮-এর দশকের শেষ থেকে আপনারা
সম্পূর্ণভাবে ওদের ক্রীড়নকে পরিণত হয়েছেন। ভারতবর্ষ কোনও বুর্জোয়া রাষ্ট্র
না হলেও এখানে একটা বুর্জোয়া পার্লামেন্টের আবরণ আছে।। ফলে, আমলাতন্ত্র-ই
এ’দেশের হর্তা-কর্তা-বিধাতা হবে এটাই স্বাভাবিক। এই
আমলাতন্ত্র নামক যন্ত্রটা এমন-ই যে সাধারণ হাত-বদলে এর কোনও পরিবর্তন হয় না। বুর্জোয়াতন্ত্র
ও সামন্ততন্ত্রের সাথে অগুনতি অদৃশ্য বন্ধনে এরা জরিয়ে থাকে, এবং চূড়ান্ত পর্বে লগ্নি পুঁজির
দালালি করে। লেনিন বলছেন: ‘The entire
history of the bourgeois-parliamentary, and also, to a considerable extent, of
the bourgeois-constitutional, countries shows that a change of ministers means
very little, for the real work of administration is in the hands of an enormous
army of officials. This army, however, is undemocratic through and through, it
is connected by thousands and millions of threads with the landowners and the
bourgeoisie and is completely dependent on them. This army is surrounded by an
atmosphere of bourgeois relations, and breathes nothing but this atmosphere. It
is set in its ways, petrified, stagnant, and is powerless to break free of this
atmosphere. It can only think, feel, or act in the old way. This army is bound
by servility to rank, by certain privileges of ‘Civil’ Service; the upper ranks
of this army are, through the medium of shares and banks, entirely enslaved by
finance capital, being to a certain extent its agent and a vehicle of its
interests and influence.’ [One of the Fundamental Questions of the Revolution] আপনারা
সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়েছেন যে, আমলাতান্ত্রিক যন্ত্রটাকে চূর্ণ করাই
হোল প্রকৃত গণ বিপ্লবের প্রাথমিক শর্ত। আপনারা ধীরে ধীরে
মার্কসবাদ-লেনিনবাদ থেকে বিচ্যুত হয়েছেন, আমলাতন্ত্রের কোলে ঢলে পড়েছেন। মানুষ ছাড়বে কেন
আপনাদের? আবেগ তাড়িত মানুষ আজ ভাবছে যে আপনাদের চেয়ে হয়তো ওরা ভালো। শত্রু-মিত্রর
হিসেবটা গুলিয়ে দিলে শেষে কি হয় দেখছেন তো? আপনাদের একটি নীলকণ্ঠের দরকার,
যে দাঁড়িয়ে খোনা গলায় বলবে: ‘ভাবো, ভাবা প্র্যাকটিস
করো।’ ভাবুন কমরেডস, better late than never.
কমরেডস, আপনারা চান বা না
চান, আমরা চাই বা না চাই, গত নির্বাচনগুলোতে জনগণের ইমোশনের প্রতিফলন ঘটে গেছে ভোট-বাক্সে। তবে ফায়দা লোটার
লোকেরা শুধু ওতেই থেমে নেই। তাদের কাছে আছে ‘মানিব্যাগ’। হ্যাঁ, মানিব্যাগ,
যার জোরে পাঁচ বছর আগে আপনারা ২৩৫ ছিলেন আর ‘ওরা’ শুধু ৩০। শিল্পপতিরা
লাভের গুড় খেতে আসেন, আর তাই প্রশাসনিক স্টেবিলিটি আশা
করেন। না দিতে পারলেই পেছন থেকে ছোরা মারেন। স্বার্থের দায়ে মোহরের ঝুলিটা
সঙ্গে সঙ্গে সরে যায় বিরোধী পক্ষের দিকে, ওদের দিকে, যারা
একসময় ৩০ ছিল।
বুদ্ধবাবু সম্ভবত ছোটবেলায় ‘তিনটি শুকর-ছানা
এবং নেকড়ের গল্প’ পড়েননি, তাই জানেন না যে, নেকড়ের ময়দা মাখানো
গলা শুনে শুকর-ছানার মতো বাঁশি বাজিয়ে কপাট খোলার মূঢ়তা লাল পতাকার ধ্বংস ডেকে আনে। উনি ভুলে
গেছেন, দেং জিয়াওপিং সাজতে হলে শুধু ‘theory of opening up to the outer
world’ আওরালেই চলে না, ‘লং মার্চ’-টাও
করতে হয়। বিপ্লবটা করতে হয় যাতে পাখিটাকে খাঁচার ভেতরে রেখে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ‘আমরা এখন
পুঁজিবাদ গড়ছি’ বললে লোকে হাসবে, কারণ পুঁজিবাদের সাহায্যে উৎপাদিকা-শক্তির বৃদ্ধি ঘটাতে গেলে
সবার আগে ক্ষমতা দখল-টা (বিপ্লব) করতে হয়। PDR is a twofold task. জাতীয় বুর্জোয়া যে দেশে প্রায় নিবীর্য, সেই দেশে
জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের মধ্য দিয়েই বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের স্তরকে সম্পূর্ণ
করে সমাজতন্ত্রের দিকে যাত্রা করতে হয়। চিন পারে, কারণ,
সে বিপ্লবটা করেছে। রং-বদলের পরেও দেশের ৮০%
কল-কারখানা এখনও রাষ্ট্রের অধীনে। আপনাদের তাত্ত্বিক অর্থনীতিবিদ প্রভাত পট্টনায়ক কি
বলেন? তিনি তো পরিষ্কার লিখেছেন: ‘China overcame poverty (as
defined in third world countries such as ours) before she
embarked on ‘market reforms’. China instituted a universal public distribution
system, which gave every citizen a certain minimum amount of
essential commodities, before she embarked on ‘market reforms’. China's stupendous achievements
in terms of social
indicators occurred before she embarked on ‘market reforms’.’ [The Difference between the
Chinese and the Indian Situations – The Marxist, Vol. 15, No. 4] এই বাঁকা
হরফের ‘before’ শব্দগুলোর গুরুত্ব বোঝেন আপনারা?
পার্টির তাত্ত্বিক মুখপত্রে
বুদ্ধ বাবু লিখেছেন: ‘We cannot
discourage investment. Had
there been an
alternative to the present form of investment we would have opted for it.’ একেবারে হক
কথা। কিন্তু ‘alternative’ কেন নেই, এটা কখন
ভেবে দেখা হয়েছে কি? ৬ এবং ৭-এর দশকে যখন প্রবল
গণ-আন্দোলনের জোয়ার গোটা দেশ জুড়ে আছড়ে পড়ছে, তখন ‘আলট্রা’ বিতরণের নাম করে জনগণের ভেতরে বিভেদ
তৈরি করেছিল কারা? বিপ্লবীদের চরিত্র হনন করে খেটে-খাওয়া
মানুষের সংগ্রামকে খতম করতে চেয়েছিল কারা? আপনারা। সেদিনের
বিপ্লবী জোয়ার ধ্বংস হওয়ার পেছনে আপনাদের দায় নেহাত কম নয়। কাশীপুর-বরানগরের রক্তে আপনাদের
দোল উৎসব। বিপ্লব হলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যেত? দুধ-মধুর বন্যা বইত? নাহঃ। তবে শীর উঁচিয়ে ‘না’ বলার ক্ষমতাটা থাকত। মানব সম্পদের ওপর ভিত্তি করে এগিয়ে যাওয়া যেত। কোনও সদ্যজাত
শিশু মাথায় বৈদেশিক ঋণের বোঝা নিয়ে বেড়ে উঠত না। আসলে, তাত্ত্বিক
বাগাড়ম্বরের পেছনে আপনারা—এই সিপিআই (এম) পার্টি—প্রতিবিপ্লবের দাসত্ব করে গেছেন। অনেক ক্ষোভে, দুঃখে
আপনাদের প্রথম পার্টি-সম্পাদক পি. সুন্দারায়া-ও বলতে বাধ্য হয়েছিলেন: ‘...even our leading cadres have not yet grasped the implications of our party being a party of the
proletariat attempting to achieve P.D. Revolution. In our programme, policy
statement, constitution, in our task documents on T.U., Kisan and party
organisation and in our political resolutions we again and again stress and
outline the tasks from the angle of revolutionary party. But on the whole, all
that remains in words while our practice is based on deep-rooted parliamentary,
legalistic illusions and on possibilities of peaceful development of our party
and movement for a long period to come. We are unable to shake off the
revisionist habits, thinking the mode of functioning in all mass fronts and in
party building.’ [My Resignation]
কাকস্য পরিবেদনা! এসব নিয়ে
আপনাদের মোটেই মাথাব্যথাই নেই। কংগ্রেস আর তৃণমূলের মধ্যে ভাঙ্গন ধরিয়ে কি করে
টিকে থাকা যায়, এই নিয়েই আপনাদের যত গবেষণা। চর্বি জমে
গেলে যা হয়। কিন্তু মনে রাখবেন, ব্যাপারটা মোটেই সহজ নয়। কংগ্রেস চাক বা না চাক, আন্তর্জাতিক
পূঁজির নির্দেশেই তাকে তৃণমূলের পদলেহন করতে হবে। শংকর সিং-দের স্থান নেই। সংকটে পরা
পুঁজিবাদ তৃণমূল
নেত্রীকে সামনে রেখে
বামপন্থাকে নির্মূল করতে চায়। পূঁজির
ডিকটাম, আর তাই তৃণমূলের লাথি-ঝাঁটা খেয়েও কংগ্রেস কান ধরে উঠবস ক’রতে রাজি। কংগ্রেসের হাতে (disposal) যা আছে সবই দিতে হবে। আজিজুল হক স্পষ্ট ভাবে দেখিয়েছেন, ‘কংগ্রেসের দায় এই দেশটাকে আমেরিকার বর্জ্য এবং বিষাক্ত মালের আবর্জনাগার করে তোলা; আমেরিকার দায় হ’ল ভারত থেকে বাম নির্মূল করা; এবং মমতার দায় পুঁজিকে দম ফেলার
সুযোগ ক’রে দেওয়ার জন্য
জনতার প্রতিরোধের দাঁত ভেঙ্গে দেওয়া। এই কারণেই শিশির অধিকারীর বাংলাদেশ থেকে অস্ত্র কেনার স্বীকারোক্তি থাকা স্বত্বেও চিদাম্বরম'কে বলতে হয় ওসব নাকি সিপিএম’এর আসারে গপ্পো।’
২০১১ সাল আসছে অনেক ভয়াবহতা নিয়ে। লাল জামা পরে বেরোনো
কিশোরী হয়তো তার জামার রঙের কারণে বাড়ি ফিরবেন অ্যাসিড বাল্বের স্মারক নিয়ে। দিনে-রাতে তৈরি
হবে বরানগর-কাশীপুর, এবং আরও ভয়ঙ্কর ভাবে। আধুনিক নরখাদকেরা ছাপিয়ে যাবে ওদের পূর্বসূরিদের, কারণ এইবার ওদের সাথে আছে কিছু
তথাকথিত বাম মস্তিষ্ক। এই ভয়াবহতাকে আটকাতে হলে চাই যুক্ত-মোর্চা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
ঘোষণা করেছেন, নকশালপন্থীদের সাথে
সি.পি.আই.(এম)-এর দ্বন্দ্ব কমিউনিস্ট পার্টির ভেতরকার ব্যাপার, কারণ
নকশালপন্থীদের জন্ম হয়েছে সি.পি.আই.(এম)-এর গর্ভ থেকেই। এই কথা থেকে
স্পষ্ট যে সাম্রাজ্যবাদী অর্থ এবং দেশের তামাম পুঁজিপতিদের টাকার জোরে
জনগণের ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে ভোটে একবার জিতে মহাকরণে ঢুকলেই ওর ফ্যাসিস্ত বাহিনী
একসাথে কোতল করবে সত এবং লড়াকু সি.পি.আই.(এম) কর্মী এবং অসংখ্য নকশালপন্থী
বিপ্লবীকে। রাজনৈতিক বিতর্কগুলোকে বজায় রেখেও তো একটা কমোন [মিনিমাম] প্রোগ্রাম-এর
ভিত্তিতে এই আধাফ্যাসিস্ত নয়া-সামন্তবাদী বাহিনীর বিরোধিতায় এক হওয়া যায়। কি, যায় না? সারে-চার বছর ধরে কংগ্রেসিদের হারেম-এ গা-ঘষাঘষির চেও কি সেটা বেশি অগৌরবের? বিহারে যে জোট আপনারা করেছিলেন
তাতে বহু বাম দল-ই সামিল হয়নি, কারণ এর উদ্দেশ্যটা ছিল নির্বাচন
কেন্দ্রিক। সুদীর্ঘ গণআন্দোলনের ভিত্তিতে এই জোট গড়ে ওঠে নি। এক ধরনের সুবিধাবাদী
দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এর জন্ম হয়েছিল। স্বাভাবিক ভাবেই জনগণ তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
এবার বলতে চাই মাওবাদীদের। দেখুন, শত রাজনৈতিক-মতবাদিক দুর্বলতা
সত্ত্বেও আপনারা মানুষকে মুক্তির স্বপ্ন দেখিয়েছেন। দন্ডকরান্যে সাধারণ প্রান্তিক
মানুষকে বাঁচতে শিখিয়েছেন। কিন্তু এ আপনারা কি করছেন এখন?! উড়িষ্যার
কোরাপুট-রায়গদার আদিবাসী কৃষক-নেতা কেন্দ্রুকা অর্জুন-কে হত্যা করেছেন আপনারা!
কারণ? সে আপনাদের পার্টির লোক নয়। আপনাদের
রাজনৈতিক নোংরামি (বলতে বাধ্য হচ্ছি) ও দেউলিয়াপনা এমন পর্যায় গেছে যে, বৈদ্যুতিক
মাধ্যমে ‘কোরাপুট-শ্রীকাকুলাম ডিভিশন কমিটি’-র পক্ষ থেকে আপনারা প্রচার করেছেন, অর্জুন
নাকি ব্যক্তি জীবনে ছিলেন চরম লম্পট। ছিঃ! জনগণের নেতার সম্পর্কে এমন
অভিযোগে কর্ণপাত করেননি ওখানকার মানুষ। তাঁর স্মরণ সভায় হাজার হাজার আদিবাসী জনতা
আপনাদের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন।
পশ্চিমবঙ্গে-ও আপনারা নৈরাজ্যের
পসরা সাজিয়ে বসেছেন। জঙ্গলমহলে ‘পুলিশের চর’ অভিযোগে আপনারা দ্বীশতাধিক খেতমজুরকে খুন করেছেন। একটা ‘গেরিলা জোন’-এ যদি এতজন প্রান্তিক মানুষ পুলিশের চর হয়, তাহলে
রাজনৈতিক কাজ আপনারা কি করলেন! আপনাদের দমনমুলক কাজ-কর্ম এমন যায়গায় গেছে যে,
প্রান্তিক মানুষ যৌথ বাহিনীকেও বন্ধু ভাবছে! যে রাক্ষসটাকে নকশাল
আন্দোলনের সময় বোতল-বন্দি করে সমুদ্রে নিক্ষেপ করা হয়েছিল, তাকেই এতদিন পর আপনারা বার করে এনেছেন। করে তুলেছেন সামাজিক ভাবে
গ্রহণযোগ্য। আপনারা মতে না মিললেই গরিব কৃষক-কে উচ্ছেদ করেছেন। কোনও কৃষক আন্দোলনে কখন
খেত-মজুর বা প্রান্তিক কৃষক উচ্ছেদ হয়? আপনারা কাদের সুবিধে করে দিচ্ছেন
একবার ভেবেছেন কি?
পিসিসি নেতা সন্তোষ রানা এক
প্রেস-বিবৃতি-তে জানিয়েছেন: ‘It has been our own experience in Lalgarh that the Maoists want to
establish their own hegemony in any area by forcibly eliminating all other
political forces. They are not ready to allow people to participate in any
political action which is different from them. Recently they have attacked our
partymembers and sympathizers in Jhargram area and ordered them to severe
connection with CPI (ML) and join the Trinamul Congress…’ রানা আরও
বলেছেন: ‘In
some areas they (তৃণমূল কংগ্রেস) are using the Maoists to eliminate genuine Left forces
and establish the rule of the reactionaries.’ [Class Struggle, Vol. 2, Issue. 9] কাদের
প্রতিনিধি এই তৃণমূল কংগ্রেস? কোন শ্রেণির স্বার্থরক্ষা কারি এরা?
অন্ধ্রের অভিজ্ঞতা থেকেও শিখলেন না? আপনাদের
পরম বন্ধু ওয়াই.এস.আর. রেড্ডি কিন্তু চন্দ্রবাবুকে সরানোর পরেই আপনাদের নিশ্চিহ্ন
করল। কোন্ডাপোল্লী সীতারামাইয়ার হাতে গড়ে ওঠা অন্ধ্র আজ বিপ্লবী-শূন্য কেন সেটা
একবার ভেবে দেখেছেন? বিপ্লব তো জনগণের উৎসব। একে দুর্বল করবেন না ‘জাস্ট
অ্যান্টি-সিপিএম’ মোর্চা তৈরি করে। পার্টি নয়, শ্রেণী দেখুন, কমরেডস। আসলে, মুখে
নকশালবাড়ির নামে স্লোগান দিলেও আপনারা নকশালবাড়ি এবং চারু মজুমদারের বিপ্লবী
লাইনের প্রতিনিধিত্ব-ই করেন না। আপনারা যেটা করছেন, সেটা বলে ‘সমরবাদ’—ভ্রাম্যমান লুটেরা রাজনীতি। মাও-এর অমোঘ
বানি ‘শ্রেণি সংগ্রাম কখন ভুলো না’-কে চারু মজুমদার
ধ্রুবতারা বানিয়েছিলেন। তাঁর কঠোর সমালোচক সন্তোষ রানা-ও স্বীকার করেছেন: ‘...Charuda insisted not to ‘touch any
tribal’, landless agri-labourers, poor and marginal peasants even if he was
opposed to us. He always asked us not to carry weapons when meeting the
peasants. He wanted us to kindle the poor people’s class consciousness first
and depend on their initiative and the weapons they use for armed actions... Charuda’s focus was always on the class
struggle and class issues.’ [Revolutionary Democracy, Vol. XVI, No. 1]
সিপিএম খুব খারাপ। সন্দেহ নেই। কিন্তু তাই
বলে তৃণমূল! যেখানে যেখানে ওরা আপনাদের বলে বলিয়ান হয়ে ক্ষমতায় এসেছে, সেখান থেকেই
উচ্ছেদ করতে শুরু করেছে পাট্টা পাওয়া কৃষককে। ‘অপারেশন
বর্গা’-র ফলে যে বদবাবুরা জামা পালটেছিল বা সেঁধিয়ে গেছিল
গর্তে, তারাই আজ বসন্তের বাতাস পেয়ে নখ-দাঁত বার করে
বেরিয়ে এসেছে। যে গুণ্ডারা খেজুরিতে লেনিনের মূর্তি ভেঙ্গেছে, যে
নরপিশাচরা বিধবা আইসিডিএস কর্মি ছবি মাহাতো কে ধর্ষণ করে নির্মম ভাবে তাকে জীবন্ত
অবস্থায় কবোর দিয়ে হত্যা করছে, তাদের পায়ের মাটি তৈরি করে
দিয়েছেন আপনারাই।
নিজের ক্যাডার ধরে রাখতে
সিপিএম-কে লড়তে হয়েছে ‘বিমা বিল’ এবং ‘পেনশন বিল’-এর বিরুদ্ধে, ‘ন্যুক্লিয়ার
ডিল’-এর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়েছে। সংসদের ভেতরে
এগুলো প্রশংসনীয় পদক্ষেপ নয়? আপনারা কেন বুঝতে চাইছেন না যে
ভারতের বিপ্লবী সংগ্রামের সাফল্য নির্ভর করছে বৃহত্তর বাম-ঐক্যের ওপর। বিপদ যখন
আসন্ন, আধা-ফ্যাসিবাদ যখন মাথা চাঁড়া দিচ্ছে, তখন
ফ্যাসিবিরোধি ফ্রন্ট গঠনকেই এক এবং একমাত্র কাজ হিসাবে দেখা উচিৎ। কমরেডস, সংকীর্ণতা
কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করুন। শত্রুর শত্রু সবসময় বন্ধু হয় না। বিপ্লব একটা জটিল প্রক্রিয়া, ওখানে পপারদের ‘ফলসিফিকেশন’ কাজে লাগে না। ব্যাপারটা দুয়ে
দুয়ে চার নয়। আপনাদের আরও স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, ৩১-এর সামাজিক ফ্যাসিবাদীরাও (সোশাল
ডেমোক্র্যাট) কিন্তু কমিন্টার্নের সপ্তম কংগ্রেসে এসে পপুলার ফ্রন্টের শরিক হয়েছিল। সংস্কারপন্থীদের
সাথে কোন আন্দোলন নয় বলে দুয়ারে খিল এঁটে বসে থাকা লাফার্জ ও তার নেতা জুলস গেসদে সম্পর্কে
মার্ক্সের শ্লেষটা মনে আছে তো? কমরেডস, এটা দ্বন্দ্ববাদ। মার্কসবাদ
রাস্তায় জমে থাকা বৃষ্টির জম নয়। তা প্রবহমান নদীর মতো। গতি-পরিবর্তন, বিকাশ এবং
রূপান্তর হ'ল দ্বন্দ্বমূলক-বস্তুবাদী চেতনার সারকথা। তাই একমুখী হবেন
না। ভেবে দেখবেন একবার। নাহলে আপনাদের ধ্বংস আসন্ন।
দুই সিপিএম—‘মার্ক্সবাদী’
এবং ‘মাওবাদী’—দুটো
বিশেষ ধারার প্রতিনিধি—দক্ষিণপন্থী সুবিধাবাদ ও বামপন্থী
সংকীর্ণতাবাদ। ‘মার্ক্সবাদী’-রা বিপ্লব-বিমুখ
হয়ে সংসদীয় আবর্জনার পাঁকে ডুবে আছে; অপর দিকে ‘মাওবাদী’-রা অতি উৎসাহে সংকির্ণতাবাদী একমুখী
পথের পথিক হয়ে বিপ্লবী সংগ্রামকে পিছিয়ে দিচ্ছে। দুজনেই শ্রেণি লাইন থেকে
বিচ্যুত। তবে অনেক বামপন্থীর কাছে সিপিএম-এর পদস্খলন যতটা চোখে পড়ছে, ‘মাওবাদী’-দের তাত্ত্বিক-রাজনৈতিক ভ্রান্তিগুলো ততটা পড়ছে না, কারণ ওরা বিপ্লবী-বুলির জাল তৈরি করে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চাইছে। স্তালিন সঠিক
ভাবেই বলেছেন: ‘It should not
be forgotten that Rights and ‘ultra-Lefts’ are actually twins, that consequently both take an opportunist stand, the
difference between them being that whereas the Rights do not always conceal
their opportunism, the Lefts invariably camouflage their opportunism with ‘revolutionary’ phrases.’ [The Fight against Right and ‘Ultra-Left’
Deviations]
বাংলার বুকে সর্বস্তরের বাম
আন্দোলন-কে সমূলে উচ্ছেদ করতেই ২০১১ সালে তৃণমূল-কে সামনে রেখে প্রতিক্রিয়ার
পুনরুত্থান ঘোটাতে চেষ্টা করছে বিশ্বসাম্রাজ্যবাদী-পাণ্ডা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এই
পরিস্থিতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন দেখিয়ে তৃণমূলের ভাড়াটে বাহিনীর কাজ করছে মাওবাদীরা। সমষ্টির
স্বার্থে অংশকে বিসর্জন দেওয়াই যে বিপ্লবী রাজনীতির অন্যতম কর্তব্য, সেটাই ওরা
ভুলে গেছে। আজ এই তৃণমূলী-মাওবাদী যৌথ আধা-ফ্যাসিবাদী বাহিনীর হুহুংকার-কে রুখতে চাই প্রকৃত
বাম-গণতান্ত্রিক যুক্ত-ফ্রন্ট।
দেরীতে হলেও গ্রামাঞ্চলের কৃষকেরা
অর্জিত অধিকার রক্ষার দায়ে প্রতিরোধ সংগ্রামে নেমেছেন। পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, পুরুলিয়ার কৃষক জনগণ গ্রামগুলো থেকে প্রতিক্রিয়ার শক্তিকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করছেন। তারা বাম ও
গণতান্ত্রিক শিবিরের সমর্থন চান, সহযোগিতা কামনা করেন। তাই এগিয়ে আসুন, আপনাদের
নৈতিক-রাজনৈতিক সমর্থন নিয়ে। আসুন, শহরে গ্রামে গড়ে তুলি প্রতিরোধী
কৃষকদের সংগ্রাম সহায়ক কমিটি। ওরা রক্ত দিচ্ছেন দেশটাকে প্রতিক্রিয়ার হাত থেকে
বাঁচানোর জন্য। আসুন, আমরা উজাড় করে দিই আমাদের সমর্থন। এই প্রতিক্রিয়া বিরোধী,
প্রতিরোধী কৃষক জনতা, তারা
মার্ক্সবাদী কম্যুনিস্ট পার্টির ছাতার তলায় থাকলেও তাদের দিকে আজ সমর্থনের হাত
বারিয়ে দিতে হবে। শ্রেণিগত ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। মনে রাখতে হবে, এই সংগ্রামী
মানুষগুলো চূড়ান্ত বিচারে সিপিএম-এর নয়, বিপ্লবীদের শ্রেণি
বন্ধু। তাঁর শেষ লেখায় চারু মজুমদার বলেছিলেন: ‘আজ আমাদের কর্তব্য হচ্ছে ব্যাপক
মূল জনগণের মধ্যে পার্টি গঠন করে কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং লড়াই-এর ভিত্তিতে
জনগণের ব্যাপকতা অংশের সঙ্গে যুক্ত মোর্চা প্রতিষ্ঠা করা...আজ বামপন্থী দলগুলো
সাধারণ মানুষের প্রতি যে অত্যাচার কংগ্রেস চালাচ্ছে তার বিরুদ্ধে লড়াই করতে
নেতৃত্ব দিচ্ছে না। সেই সমস্ত দলগুলোর মধ্যেকার শ্রমিক-কৃষক জনগণের তাঁদের দলের নেতৃত্বের
বিরুদ্ধে বিক্ষোভ রয়েছে। ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের ভিত্তিতে আমাদের তাঁদের সাথে
ঐক্যবদ্ধ হবার প্রচেষ্টা চালাতে হবে। এমনকি যারা একসময় আমাদের প্রতি শত্রুতা করেছে, বিশেষ পরিস্থিতিতে
তারাও আমাদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হতে এগিয়ে আসবে। এইসব শক্তির সাথে ঐক্যবদ্ধ হবার
মতো মনের প্রসারতা রাখতে হবে। মনের প্রসারটা কমিউনিস্টদের গুণ।’ [জনগণের স্বার্থই পার্টির
স্বার্থ] আজ এই কথাগুলো জনগণের মৌলিক দিবিতে পরিণত হয়েছে। বৃহত্তর স্বার্থেই দরকার বাম
শক্তির ঐক্য।

লেখাটা ভাল, কিন্তু আরেকটু হলে ভাল লাগত। মানে শেষটা একটু abrupt মনে হল।
ReplyDelete